চৈত্রের গরমে তৃষিত গলা ভেজাতে অনেকেই ভিড় জমান রশিদ, বাবু কিংবা মোয়াজ্জেমের কাছে। কাওরান বাজারে এরা ডাব বিক্রি করেন। ডাবের পানিতে অন্যের তৃষ্ণা মিটলেও নিজেরা খাচ্ছেন ট্যাপের পানি। আশপাশের কোন খোলা উত্স থেকে বোতলে ভরা পানি মুখে দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করছেন। কোমরে বাঁধা গামছা খুলে মুখের ঘাম মুছে আবার ডাব কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই তাদের রোজকার জীবন।
বউ ছেলে মেয়ে বাড়িতে রেখে এসে দু’-তিন মাস পর দেখতে যান। পরিবারের আড়ালে থেকে কষ্ট হয় কিন্তু করার কিছু নেই। জীবিকার তাগিদে ঢাকা আসতে হয়। কারো কারো অপেক্ষা ছেলেটা বড় হবে কবে? তাকেও নিয়ে আসতে হবে, কাজে লাগাতে হবে। বাড়াতে হবে সংসারের আয়।
এই যাদের জীবনের ব্রত এমনি একজন মোয়াজ্জেম। বাড়ি বগুড়ায়। দারিদ্র্যের কারণে তারুণ্য ধরে রাখতে পারেননি। চল্লিশ পার হয়নি তবু নুইয়ে গেছে শরীরটা। অজান্তে কোন অসুখ বাসা বাঁধছে কে জানে— তবু জীবন সংগ্রামে থেমে নেই। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই জীবন শেষ। বললেন, ‘টানাটানির সংসারে কোনমতে দু’মুঠো খেয়ে জীবন চলা। একা আর চলছে না। তাই ছেলেটাকেও ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে।’
নানা ঘাটে কিছু দিতে হয়
মোয়াজ্জেমের স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে ঢাকায় এনে ডাব বিক্রির কাজ দেবেন। তাতে আয় বাড়বে। পরিবার সুখে থাকবে। অথচ ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগটাও এরা কাজে লাগাতে পারছেন না। ঢাকার কাছেই জয়দেবপুরে বাবুর বাড়ি। তার সঙ্গে আছেন রশিদও। রশিদও ছোট বয়সেই এই কাজ শুরু করছেন। ১৮ বছর ধরে কাওরান বাজারে ডাব বেচেন তিনি। আড়ত থেকে বাকিতে আনেন। প্রতিদিন ৪/৫শ’ ডাব নিয়ে বসেন। ৩ থেকে সাড়ে ৩শ’ বিক্রি হয়। প্রতিটি ডাবে ৩ থেকে ৫ টাকা লাভ হয়। বিক্রি শেষে রাতে আড়তদারকে মূল্য পরিশোধ করেন। ডাব বিক্রি করে এরা দৈনিক ৮শ’ থেকে এক হাজার টাকা লাভ করেন। তবে ঝুঁকিও কম নয়। নানা ঘাটে কিছু দিতে হয়। ব্যবসা চালাতে গেলে এরকম দেয়া নাকি নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবু ভাল, কিছু করে খেতে পারছেন।
শান্তিনগর মোড়ে ছুরিতে ধার দিচ্ছেন রাসেল। সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে তৈরি তার যন্ত্রটি কাঁধে নিয়েও ঘোরা যায়। থাকেন মগবাজারে। আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে তার ‘শাণ’ দেয়ার বাণিজ্য। সিলেট থেকে ঢাকায় আসার লক্ষ্যই ছিল টাকা আয়। বললেন, ‘কাজ না করে বসে থাকতে পারি না। তাই ঢাকায় চলে এসেছি।’
পরিশ্রমে ধনী হওয়া যায়
ঢাকায় আসা রাসেলের সার্থক হয়েছে। দৈনিক সাড়ে তিন থেকে চারশ’ টাকা আয় করেন। বাড়িতে মায়ের কাছে টাকা পাঠান। আর তা করতে পেরে খুব খুশি। বললাম, সিলেটের লোকেরাতো ধনী। রাসেল বললেন, পরিশ্রম করলে ধনীতো হবেই। পায়ে প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে আনন্দের হাসি দিয়ে বললেন- ভালই আছি।
চাহিদা কম, তাই লোভ নেই রাসেলের কিংবা রাসেলদের মত যারা অল্প পুঁজি দিয়ে স্বকর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছেন। সুমনের কথাও একই রকম। কুমিল্লার ছেলে সুমন নিজেই ঢাকায় এসে নিজের এই নাম দিয়েছেন। নীলক্ষেত মোড়ে আম-পেয়ারার ভর্তা বিক্রি করেন। কাসুন্দি আর সামান্য মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে পাঁচ কিংবা দশ টাকায় বিক্রি করেন। কাঁচা আম এখনো বাজারে কম পাওয়া যায়। কিন্তু পছন্দের কারণে কাঁচা আম বানিয়ে খেতে তরুণীদের অনেকেই তার কাছে খানিক দাঁড়ান। নীলক্ষেতে বই কিনতে আসেন অনেকেই। তাদের কেউ কেউ সুমনের ক্রেতা। বাবা নেই। বিক্রি করে গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠান। ‘ফেরিগিরি’ই দুবেলা খাওয়াচ্ছে তাকে। লেখাপড়া করতে পারেনি। তাই এ কাজে সন্তুষ্ট সুমন।
