বন্ধ হয়নি সুন্দরবন দিয়ে জাহাজ চলাচল

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২৩:০৯
গত তিন বছরেও বন্ধ হয়নি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও কার্গো চলাচল। এ কারণে বনে প্রাণীর বিচরণ আশংকাজনক হারে কমছে। বিশেষ করে প্রাণীশূন্য হতে শুরু করেছে বনের পূর্বাঞ্চল। বর্তমানে বনের ভিতর দিয়ে প্রতিদিন বড় আকারের অন্তত দেড়শ’ জাহাজ চলাচল করছে। জাহাজের সৃষ্ট ঢেউ বনের মধ্য দিয়ে বহমান নদীর দুই পাড়ে ভাঙন সৃষ্টি করেছে। নৌযান নি:সৃত বর্জ্য-তেল দূষিত করছে নদীর পানি। হর্ন-সাইরেনে ঘটছে শব্দদূষণ। ঝুঁকিতে পড়েছে ডলফিনের অভয়ারণ্য। বিচরণ কমেছে মাছের। মরতে শুরু করেছে বৃক্ষ-লতা। সবমিলিয়ে অবৈধ এই নৌ-চলাচলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন-সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে জীব-বৈচিত্র্য। মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল (নৌপথ) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০১১ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে না জানিয়েই সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে নৌযান চলাচল চালু করে নৌ মন্ত্রণালয়। বনের ভিতর দিয়ে সন্নাসী-রায়েন্দা-বগী-শরণখোলা-দুধমুখী-হরিণটানা-আন্ধারমানিক-মৃগমারি-চাঁদপাই-জয়মনিগোল-মংলা পথে চলতে শুরু করে ভারি জাহাজ-কার্গো। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করে বন বিভাগ। পথটি বন্ধ করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশও দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও চ্যানেলটি দিয়ে ভারি জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশংকায় এবং বনটিকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) গত বছর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ ও বন অধিদপ্তর সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে পরিচালিত নৌপথটি বন্ধের সুপারিশ করে। এছাড়া মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথটি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অবিলম্বে চালু করারও সুপারিশ করা হয়। আর এ পথ চালু না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প পথ গ্রহণ করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে সুপারিশ পাঠায় বিকল্প নৌ-রুট অনুসন্ধান বিষয়ক আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটির সভাপতি এম এ হান্নান বলেন, এ নৌপথ দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এজন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বনের অভ্যন্তর দিয়ে কোনোভাবেই জাহাজ চলাচল করতে দেয়া যাবে না। মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে এবং সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথটি চালু করা হয়। পরে নৌপথটির দু’পাশে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি ঘের গড়ে উঠে। এ কারণে চ্যানেলটির বিভিন্ন স্থান পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় নৌপথটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর বনের ভিতর সংরক্ষিত এলাকার মধ্য দিয়ে নৌপথ চালু করে নৌ মন্ত্রণালয়। শুরুতে দিনে ২৫-৩০টি ভারি জাহাজ-কার্গো-তেলবাহী ট্যাংকার চললেও বর্তমানে প্রতিদিন একশ’ থেকে দুইশ’ জাহাজ এ পথ ব্যবহার করছে। ধ্বংস হচ্ছে প্রাণীর আবাসস্থল: বিশেষজ্ঞ এবং সুন্দরবনে কর্মরত বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বনের অভ্যন্তরে চালু হওয়া নৌ পথটি ঘিরে বাঘ, হরিণ, বন বিড়াল, কচ্ছপ, বন্য শুকর, বানর, কুমির, সাপসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পশু-পাখির বিচরণ বেশি। এ নৌপথের অন্তর্ভুক্ত মৃগমারিকে কুমিরের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা করেছিল বন বিভাগ। কিন্তু বর্তমানে এ অঞ্চলে কুমির তেমন দেখা যায় না। কর্মকর্তরা আরো জানান, ওই চ্যানেলেই সুন্দরবনের তিনটি ডলফিন অভয়ারণ্যের সবগুলো অবস্থিত। জাহাজ চলাচলের কারণে বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিনের অবাধ চলাচল বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। বগী থেকে শরনখোলা হয়ে দুধমুখী সংলগ্ন ভোলা নদীতে মাছের পরিমাণ কমছে আশংকাজনক হারে। প্রপেলারের আঘাতে মরছে জলজ প্রাণী। ভ্রণ অবস্থায়ই মারা যাচ্ছে সামুদ্রিক উদ্ভিদ। এদিকে বনের ভিতর দিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় জাহাজ থেকে নি:সৃত তেল ও বর্জ্য হুমকির মুখে ফেলেছে বনের জীব-বৈচিত্র্য ও নির্মল পরিবেশকে। এছাড়া এ নৌপথের নদী ও খালের পাড়ে বিদ্যমান গাছের গোড়া থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ভেঙ্গে গেছে অনেক গাছ। শরণখোলা রেঞ্জের বগী খালে প্রায় ২৫ ফুট এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। বন বিভাগের বগী স্টেশনটি নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া বনের অভ্যন্তরে চলাচলের সময় জাহাজগুলো প্রচণ্ড জোরে হর্ন-সাইরেন দিচ্ছে। এতে প্রাণীরা আতংকগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জাহাজ চলাচল বনের গোটা ইকো সিস্টেম নষ্ট করছে। এভাবে চলতে থাকলে এ অঞ্চলে বনের ঘনত্ব কমবে, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হবে। এছাড়া বনের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। নৌযান চলাচল করায় বিনা অনুমতিতে ও কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রতিদিন অন্তত ৫০০ মানুষ বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এতে বন্য প্রাণী পাচারের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই পথটি দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন। আইন-চুক্তির ভয়াবহ লঙ্ঘন: সুন্দরবন একটি সংরক্ষিত বন। এটি জাতিসংঘের ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯২ সালে এ বন রামসা এলাকাভুক্ত হয়। বন আইন ১৯২৭ (সংশোধিত ২০০০) অনুযায়ী এ বনের ভিতর দিয়ে চলাচল করতে হলে বন বিভাগের অনুমতি গ্রহণ করতে হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ভারি নৌযান চলাচলও নিষিদ্ধ। কিন্তু সব আইন উপেক্ষা করেই সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে জাহাজ চলছে। বিকল্প নৌ-পথ চালুর চিন্তা :সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধে তিনটি বিকল্প পথ চিহ্নিত করা গেছে। বিকল্প নৌপথটি চলতি মার্চের মধ্যেই চালু করতে সুপারিশ করেছে এ লক্ষ্যে গঠিত বিকল্প নৌ-রুট অনুসন্ধান বিষয়ক আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান ড. মো. শামসুজ্জোহা খন্দকার বলেন, সুন্দরবনের বর্তমান রুটটি বন্ধ করে মংলা-ঘষিয়াখালী রুটটি আবারো চালু না হওয়া পর্যন্ত তিনটি বিকল্প নৌপথ নির্ধারণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দিলেই বিকল্প পথে জাহাজ চলা শুরু হবে। এছাড়া আগামী চার-পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথে ড্রেজিং শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।