প্রোডাক্ট ম্যানেজার

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৪, ১৯:৪১
সময়ের সাথে সাথে প্রজন্মের পেশা জগতে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তেমনই একটি পেশা হচ্ছে পণ্যের বিপণন ব্যবস্থাপনা। ভোক্তার কাছে পণ্যটি পরিচিত করে তোলা থেকে শুরু করে, পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ করাও একজন প্রোডাক্ট ম্যানেজারের কাজ। একজন ভোক্তার নিকট পণ্যকে নির্ভরযোগ্য করে তুলতে একজন প্রোডাক্ট ম্যানেজার তার মেধা এবং মননের সমন্বয় ঘটান। প্রজন্মের কাছে তাই এই সৃজনশীল পেশার গ্রহণযোগ্যতাও অনেক। তাই এ প্রজন্মের মেধাবী কয়েকজন প্রোডাক্ট ম্যানেজারদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র একেএম মইনুল ইসলাম বিপণন প্রধান, প্রাণ কনফেকশনারি প্রোডাক্টস সবার ভালোবাসা পেয়ে পেয়েই কেটেছে তার শৈশব। পরিবারের ছোট ছেলে বলে কোনো কিছুর জন্যই তাকে জবাবদিহি করতে হয়নি। বাবা-মা খুব চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হবে, সেই দিকটাতেও খুব আগ্রহ হয়নি তার। বিপণন ব্যবস্থাপনা আর ব্র্যান্ডিংয়ের মতো দিকটাতেই নিজেকে নিয়ে এলেন। দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব নিয়ে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তিনি একেএম মইনুল ইসলাম, প্রাণ কনফেকশনারি লিমিটেডের বিপণন বিভাগের প্রধান। সেই সাথে প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সবকিছু নিয়েই সফল এই কর্পোরেটের পথ চলা। মইনুল ইসলাম সবসময়ই নিজেকে বৃত্তের বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। পণ্যের প্রসারে ও তার সঠিক ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য নিত্যনতুন ধারণার প্রবর্তন করেছেন তিনি। আর এই পেশায় তিনি কতটা আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেছেন তার বড় প্রমাণ নিজের দুটি ব্র্যান্ডের ২০১৩ সালে সেরা ব্র্যান্ড হওয়ার খেতাব অর্জন। মইন সবসময়ই চান বর্তমান দ্রব্যসামগ্রীর বাইরেও নতুন এবং মানসম্পন্ন আরও জিনিস বাজারে আসুক, তাহলে নতুন নতুন ব্র্যান্ড গড়ে তোলার সুযোগ হয়। আর একটা প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং একটা চলমান প্রক্রিয়া, এটা ক্ষণিকের জনপ্রিয়তা বা পরিচিতি দিয়ে মাপ করা যাবে না। প্রজন্মের মেধাবী এই ব্যবস্থাপক মনে করেন, সময়ের সাথে সাথে আমাদের দেশের কর্পোরেট সেক্টরে প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজের সুযোগ অনেক বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির দিকে অনেক এগিয়ে, তাদের সামনে উন্মুক্ত সম্ভাবনার সকল দুয়ার। সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। আর নিজেদের জানার পরিধিটা বাড়াতে বাইরের দুনিয়ার খোঁজখবর রাখতে হবে। আমাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সাহস গড়ে তুলতে হবে প্রজন্মের মাঝে। আর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অনেক কিছু করার সুযোগ আমাদের দেশে, সেটার সঠিক সুযোগটা বুঝে সবাইকে সেই মাফিক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানালেন মইনুল ইসলাম। সফল এই কর্পোরেট বড় হয়েছেন ঢাকার পরিবেশেই। বন্ধুবান্ধবের সাথে দিনভর আড্ডা আর থিয়েটার নিয়ে মেতে থাকতেন একসময়। যুক্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথেও। কাজের টানে সেই জগতটা দূরে ফেলে এলেও অন্তরে ধারণ করেন এক শৈল্পিক মন। মইনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা ঘিরে তার একমাত্র কন্যা অনিন্দিতা। স্ত্রী নাসিমা ইসলাম তার সব কাজের প্রথম সমালোচক এবং একজন পরিচায়কও বটে। একেএম মইনুল ইসলাম তার কাজের ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতার আরও স্বাক্ষর রাখবেন। দেশীয় ইন্ডাস্ট্রিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। আর তিনি আরও নতুন নতুন সফল ব্র্যান্ড তুলে ধরবেন আমাদের সামনে, এই শুভ কামনা তার জন্য। একেএম মইনুল ইসলাম ডাকনাম :মইন জন্মতারিখ ও স্থান :২৮ জানুয়ারি, ঢাকা মায়ের নাম :ফিরোজা বেগম বাবার নাম :মো. দবির উদ্দিন প্রথম স্কুল :কালাচাঁদপুর হাই স্কুল প্রিয় মানুষ :আমার মেয়ে প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট প্রিয় উক্তি :Miles to go before I sleep. অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, আবৃত্তি করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :সুখী হতে পারা। ০০০০ ফারজানা হোসেন প্রোডাক্ট গ্রুপ ম্যানেজার, এসিআই লিমিটেড কতগুলো শহর আর স্কুলে পড়েছেন তিনি বলতে গেলে রীতিমতো দ্বিধায় পড়ে যেতে হবে। প্রতি ক্লাসেই নতুন নতুন স্কুল! ছোট্ট এই দেশের অনেকগুলো সেনানিবাসে ঘুরে ঘুরে তার শৈশব কেটেছে। নিজের অজান্তেই শৈশব থেকে লালন করে এসেছেন নিয়মানুবর্তিতার কঠিন ছক, পেয়েছেন বিভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দীক্ষা। তিনি ফারজানা হোসেন, এসিআই লিমিটেড ফিমেল ও বেবি হাইজিন প্রোডাক্টগুলো নিয়েই এখন যার নিত্য ভাবনা, এই ব্র্যান্ডগুলোর গ্রুপ প্রোডাক্ট ম্যানেজার তিনি। রিয়েল এস্টেটের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেও বৈচিত্র্যের খোঁজে যোগ দিয়েছিলেন ব্র্যান্ডিংয়ে। এখন এখানেই স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে কাজ করছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনে যোগ দেন ফারজানা। এরপর কাজ করেছেন মেট্রো অথবা কনকর্ডের মতো স্বনামধন্য রিয়েল এস্টেটে। সেখানে মূলত সেলসে কাজের অভিজ্ঞতা হলেও একটা সময় একঘেয়েমি চলে আসে। তারপর এসিআই লিমিটেডে কাজের আমন্ত্রণ পান। আর এদিকটাতে এসেই আসলে নিজের পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগানোর সুযোগ পান। এসিআইয়ের ফ্রিডম ব্র্যান্ডের শুরু থেকেই তার এটার সাথে কাজ করা। আর ব্র্যান্ডিং তো কেবল চাকচিক্য বিজ্ঞাপন নয়, এর সাথে জড়িত অনেক কিছু। পণ্যের মান আর সেবাটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই দিকটাও একজন প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে তত্ত্বাবধান করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ফারজানা হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশে মূলত নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই আমাদের দেশীয় কর্পোরেট হাউজে ব্র্যান্ডিং কথাটা জনপ্রিয় হতে থাকে। এর মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানের একটা বাড়তি ইমেজ তৈরি হয়, ভালো ধারণার জন্ম হয়, এটা উপলব্ধি করেন সংশ্লিষ্টরা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায় নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই আমাদের দেশে ব্র্যান্ডিংয়ের অনেক ভালো ভালো ক্যাম্পেইনও হয়েছে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো বাইরেও যাচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতেই আমাদের এই পণ্যের ব্র্যান্ডিং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে বলেও আশাবাদ তার। তবে এজন্য এর সাথে সম্পৃক্তদের দলগতভাবে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। ব্র্যান্ডটাকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে হবে। আর নতুনদের আসলে শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। আর যেকোনো কাজের ধারাবাহিকতা রাখতে হবে, তাহলে সফলতা আসবেই। সফল এই প্রোডাক্ট ম্যানেজারের বাবা একজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিলেন কদিন আগে, আর মা গৃহিণী। দুই বোনের মাঝে বড় তিনি। স্বামী ফেরদৌস রাশেদ রুমন আর একমাত্র সন্তান আহমেদ তাহসিন ফেরদৌসকে নিয়েই তার সংসার। শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারকে চান অবসর সময়টায় আগলে রাখার। ফারজানা হোসেন ডাকনাম :শাম্মী মায়ের নাম :মিসেস আশরাফুন্নেসা বাবার নাম :ব্রি. জে. (অব.) ইসমাইল হোসেন জন্মতারিখ ও স্থান :২৮ জানুয়ারি, ঢাকা প্রথম স্কুল :রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় উক্তি :When one door of happiness closes, another opens; but often we look so long at the closed door that we do not see the one, which has been opened for us. প্রিয় পোশাক :শাড়ি অবসর কাটে যেভাবে :ভ্রমণ করে, ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :আত্মতৃপ্তি আর নিজের জানাটাকে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারা। ০০০০ মিলটন কুন্ডু প্রোডাক্ট ম্যানেজার, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস ছোটবেলা থেকেই তার আগ্রহ ছিল যেকোনো বিষয়ে বিশদ জানা। চিকিত্সা ও ওষুধ বিজ্ঞানের উপরও ছিল বেশ টান। ২০১০ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে অর্নাস শেষ করে চাকরি জীবন শুরু করেন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে প্রোডাকশন অফিসার হিসেবে। বছর দেড়েকের মধ্যে ওষুধ প্রস্তুত সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিয়ে এরপর ব্র্যান্ড এক্সিকিউটিভ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসে। সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দুই বছরের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে ব্র্যান্ড ম্যানেজার পদে উন্নীত হন। তিনি মেধাবী প্রোডাক্ট অ্যান্ড ব্র্যান্ড কর্মকর্তা মিলটন কুন্ডু। মিলটনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামে। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ার ফলে জীবনের বিভিন্ন প্রান্তে ঠেকে ঠেকে অনেক কিছুই শিখেছেন যা আজ নিজেকে অনেকের চেয়ে একটু আলাদা করে ভাবতে শেখায় তাকে। তার স্ত্রীও একজন ফার্মাসিস্ট, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসে কোয়ালিটি অ্যাসুয়ারেন্স অফিসার হিসেবে কর্মরত। বাবা ব্যবসায়ী ও মা গৃহিণী। মা, বাবা, স্ত্রী ও ছোট ভাইকে নিয়ে তার পারিবারিক আবহ। নিজের কাজের পরিধি সম্পর্কে মিলটন বলেন, ‘ফার্মাসিউটিক্যালসে প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। এখানে আমরা সরাসরি প্রোডাক্ট ব্যবহারকারীর কাছে প্রোমোশন করি না। ফার্মাসিউটিক্যালস ব্র্যান্ডিংয়ে আমাদের সরাসরি কাস্টমার হলো ডাক্তাররা (যারা তাদের ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে পণ্যের ব্যবহারকারীকে প্রভাবিত করে)। যেকোনো প্রোডাক্টের প্রমোশনের সকল দিক এবং প্রোডাক্টি সম্পর্কিত সকল ক্লিনিক্যাল তথ্য সরবরাহ করা আমার দায়িত্ব।’ ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্টে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানে কাজের স্বাধীনতা অনেক। রয়েছে নিজেকে সৃষ্টি করার সুযোগ। ফার্মাসিউটিক্যালস ব্রান্ডিং—এ কাজটা নিজের পছন্দ অনুসারে করা যায় ও আপন জ্ঞান ভাণ্ডারকে কাজে লাগানোর রয়েছে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান। আর নতুনদের কাজ সম্পর্কে মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘নতুনরা যারা চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী এবং কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে, তারা এ পেশায় ভালো দক্ষতা প্রমাণ করতে পারবে। এই পেশায় কাজকে ভালোবেসে নিজের মনে করে কাজ করলে সফলতা আসবেই। মিলটনের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন—সত্ ও সরল জীবন যাপন করা ও ফার্মাসিস্ট হিসেবে নিজের সাধ্যমতো নিজের প্রতিষ্ঠান ও দেশের ওষুধ শিল্পে অবদান রাখা। মিলটন কুন্ডু ডাকনাম :মিলটন জন্মতারিখ ও স্থান :১১ এপ্রিল, মাগুরা মায়ের নাম :আরতী কুন্ডু বাবার নাম :গৌর চন্দ্র কুন্ডু প্রথম স্কুল :শ্রীকোল প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :মা ও বাবা প্রিয় উক্তি :A journey of thousand miles must begin with a single step. প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :ইন্টারনেটে তথ্য খুঁজে ও গান শুনে। সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজেকে সৃষ্টি করা।