উন্মাদনার কোরিওগ্রাফার

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৪, ১৯:৪৩
চলমান টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের কোরিওগ্রাফার তিনি। এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বিশ্বকাপের থিমসংয়ের কোরিওগ্রাফি করলেন এবং মাতিয়ে দিলেন বিশ্বকে। তার আইডিয়া থেকেই শুরু হয়েছে ফ্লাশ মব নামক নতুন উন্মাদনার। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত দেশসেরা এই কোরিওগ্রাফারের নাম মো. তানজীল আলম। তার গল্প শোনাচ্ছেন আহসান রনি ছোটবেলায় মাইকেল জ্যাকসনের খুব ভক্ত ছিলেন। জ্যাকসনের নাচের ভিডিও দেখে তার মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন। স্বপ্ন দেখতেন একজন বড় নাচিয়ে হয়ে ওঠার। এই স্বপ্নের ডেমো হিসেবে ক্লাস সেভেনে থাকা অবস্থায় স্কুলের ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় মাইকেল জ্যাকসন সাজলেন তানজিল। বিখ্যাত ‘বিট ইট’ গানে নেচে দেখালেন সবাইকে। সবাই খুব আনন্দ পেয়েছিল বলে স্কুলে তার নাম হয়ে গেল ‘মাইকেল জ্যাকসন’। ‘তানজিল’ থেকে ‘জ্যাকসন’ হওয়াকে ভালোই উপভোগ করতেন সে সময়। কিন্তু শুধু ডিভিডি দেখে নাচিয়ে হওয়া যায় না, নাচ শিখতে হয়। এই বোধোদয়ের পরই আজমীরী আনোয়ার কুমকুম নামের এক নাচের শিক্ষকের কাছ থেকে ক্লাসিক্যাল নাচ শেখা শুরু করেন তিনি। এই শেখার কাজ চলে দীর্ঘ আড়াই বছর। তানজীনের মধ্যে ছিল নতুন কিছু করার তাগিদ। তাই তো তিনি ক্লাসিক্যাল নাচ শেখা বাদ দিয়ে সোপানের কাছ থেকে ওয়েস্টার্ন ডান্স শেখা শুরু করলেন। ওয়েস্টার্ন ডান্স নিয়ে নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে বন্ধু সুমন, বাবু ও ওলিকে নিয়ে ১৯৯৯ সালে শুরু করলেন ‘ঈগল ডান্স কোম্পানি’। শুরুতে ছোট ছোট প্রোগ্রাম করলেও ২০০৩ সালে ‘চ্যানেল আই সিটিসেল লেটস মুভ’ নামক অনুষ্ঠান থেকেই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলেন। সাড়া পেতে শুরু করে তার দল। ২০০৪ সালে কয়েকটি টিভি চ্যানেলে বেশকিছু অনুষ্ঠান করে, কয়েকটি কর্পোরেট শো ও নানা ছোট-বড় অনুষ্ঠান করে সকলের সামনে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে ফেলে ‘ঈগল ডান্স কোম্পানি’। ২০০৫ সালের পর তাই আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। এর পরে অনুষ্ঠিত এমন কোনো বড় ইভেন্ট হয়নি যেখানে তারা কাজ করেননি বলে দাবি করলেন তানজীল। তানজীলের মা গৃহিণী ও বাবা আর্মি অফিসার। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে তার মতো আর্মি অফিসার হবে। কিন্তু ছেলে হলেন কোরিওগ্রাফার। কী প্রতিক্রিয়া বাবার? তানজীল বলেন, ‘বাবা প্রথম দিকে সমর্থন না করলেও ২০০৭ সালে বড় বড় কিছু প্রোগ্রাম করার পর কিছুটা সমর্থন দেন। ২০০৯ সালে ‘আমার প্রাণের প্রিয়’ চলচ্চিত্র কোরিওগ্রাফি করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে বাবার সমর্থন পাওয়া গেছে।’ তিনি জানালেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি বাবিসাস, বাচসাস, সিজিপি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নানা ধরনের স্বীকৃতি তো আছেই। এ ছাড়া ২০১১ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ‘ট্রাইনেশন শো’তে বাংলাদেশি স্টারদের নাচের কোরিওগ্রাফি, বিপিএল এক ও দুইয়ের অনুষ্ঠানগুলোর নাচের কোরিওগ্রাফিকে নিজের পুরস্কার হিসিবে গণ্য করেন তরুণ ও মেধাবী এই কোরিওগ্রাফার। ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল’, ‘কিছু আশা কিছু ভালোবাসা’, ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘অগ্নি’সহ অনেকগুলো চলচ্চিত্রের গানের কোরিওগ্রাফি করেছেন তিনি। এ ছাড়া নোকিয়া, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, গ্রামীণফোন, ইউনিভার, স্যামসাংসহ বড় বড় কোম্পানির অনুষ্ঠানের পারফর্ম করেছে তার দল। এ ছাড়া বাংলালিংক, এয়ারটেল, রবিসহ অনেকগুলো কোম্পানির টিভি অ্যাডের কোরিওগ্রাফি করেছেন এই নবীন কোরিওগ্রাফার। তবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে শুরু হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের থিম সং ‘চার ছক্কা হইচই’ গানের কোরিওগ্রাফি করে সারা পৃথিবীর মানুষকে মাতিয়ে তুলেছেন তিনি। তানজীল জানালেন এই মহাযজ্ঞের সাথে যুক্ত হওয়ার গল্প—‘পরিচালক আশিকুর রহমান ও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘গ্রে এজেন্সি’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মারুফ ফোন দেন। তারা যখন বিশ্বকাপের থিম সংয়ের কোরিওগ্রাফি করতে বলেন আমি নিজেও পুলকিত ও শিহরিত হই। ফুয়াদের মিউজিকে একটু নতুন ধরনের কোরিওগ্রাফি করার কথা বলেন তারা। টাইটেল সংয়ের জন্য আমি ৫টা মুভস এজেন্সিকে দিই আইসিসিকে দেখানোর জন্য। পরবর্তীতে আমার পছন্দের এই মুভটিই সিলেক্ট হয়। এটি নাচের মডার্ন ফর্মের স্টাইলে করা নাচ। রিহার্সাল ও শুটিংয়ের অভিজ্ঞতাও চমত্কার, কারণ ডিরেক্টর ও ডান্স টিমের সবাই ছিলেন তরুণ। ফলে কাজ করে অনেকে আনন্দ পেয়েছি।’ কাজের পর দেশসেরা বিজ্ঞাপন নির্মাতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, সেলিব্রেটিসহ প্রচুর ভক্তদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। তিনি বিশ্বকাপের ডিরেক্টর টিমকে প্রস্তাব দেন ‘ফ্লাশ মব’ নামক নতুন কিছু করা যায় কি না। তিনি আইসিসিকে বোঝাতে সক্ষম হন ‘ফ্লাশ মব’-এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আরও ভালোভাবে পৌঁছানো যাবে। এরপর ঢাকার ছয়টি, সিলেটের দুইটি চট্টগ্রামের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে তৈরি হয় ‘ফ্লাশ মব’। যা শুধু দেশকে নয়, সারা পৃথিবীকে মাতিয়ে তুলেছে। তানজীল জানালেন, ফ্লাশ মবের এই আইডিয়াকে গ্রহণ করে ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ডসহ অনেকগুলো দেশ অনেক সুন্দর সুন্দর ফ্লাশ মব তৈরি করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি কলেজ, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তো আছেই। তানজীল জানালেন তরুণ প্রজন্ম নাচ শেখা ও শেখানোর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কিন্তু তরুণদের জন্য এই পেশাটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তা ছাড়া ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের মতো এই পেশার এখন সম্মানও অনেক। এ ছাড়া এই পেশায় অর্থ আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে। তানজীলের পরামর্শ, নাচ শিখে তারপর ডান্সার হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। তানজীল স্বপ্ন দেখেন দেশের মডার্ন ডান্সকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যখন অন্যদেশীয় কালচারকে বাংলাদেশি গানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে। তানজীলের স্বপ্ন সফল হোক এবং তার সফলতার ধারা অব্যাহত থাকুক এই শুভকামনা রইল তার জন্য। মো. তানজীল আলম ডাক নাম :তানজীল মায়ের নাম :রোকেয়া আলী বাবার নাম :মো. খোরশেদ আলী প্রথম স্কুল :বশির উদ্দিন আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রিয় পোশাক :প্যান্ট-টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :মাকে সময় দিই এবং ঘুরতে বের হই। সাফল্যের সংজ্ঞা :সময়ের মধ্যে নিজের কাজটা সঠিকভাবে শেষ করাকেই আমি সাফল্য বলে মনি করি। প্রিয় মানুষ :ফারাহ খান, গণেশ হেগরে, দেভাবি মার্চেন্ট।