১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াল সে রাত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া টগবগে তরুণ ‘খোকন’। বড্ডো বেশি ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, পিতৃতুল্য। ২৫ মার্চ রাতে তিনি অনেকবার বঙ্গবন্ধুকে নিষেধ করলেন বাড়িতে থাকতে। বঙ্গবন্ধু পুত্রসম খোকনকে বলেছিলেন, ‘তুই চলে যা’। বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের বন্ধু ছিলেন ‘খোকন’। সাহসী, উদ্যমী, খেলোয়াড় খোকন বলেছিল, ‘চাচা আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। বঙ্গবন্ধু পুত্র স্নেহে পিঠ চাপড়ে ছিলেন খোকনের।’
চাচা অর্থাত্ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছেড়ে আসেননি খোকন। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে বন্দুক হাতে পাহারা দেন। রাত গভীর হতেই বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনীর কনভয় চলে আসে বাঙালির মহান নেতাকে গ্রেপ্তার করতে। পাকবাহিনীর কনভয়ে গুলি ছুঁড়তে লাগলেন খোকন। পাকবাহিনীর সৈন্যরা তীব্র ব্রাশ ফায়ার চালালো খোকনের উপর। বাঁ হাতটি উড়ে যায়, নিথর দেহটি পড়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নং বাড়ির গেটে। টেনে-হিঁচড়ে লাশটিকে ওরা ছুঁড়ে ফেলে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে, লেকের ধারে। তিন দিন লাশটি নিথর পড়ে থাকে সেখানে। ’৭১ এর ২৫ মার্চের প্রথম শহীদ হিসেবে ‘খোকনের’ নামটি অনেক জায়গায় উল্লেখিত হয়। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খোকনকে ভুলে যাননি। ধানমন্ডিস্থ ৮নং রোডের মাঠটিকে তিনি উত্স্বর্গ করেছিলেন ‘শহীদ খোকন স্মৃতি ক্লাব’ হিসেবে। শ্বেত পাথরে লেখা নামফলকটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উন্মোচনের নামটিও ছিল। পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের সময়ে বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত একজন শহীদের প্রতি উত্স্বর্গকৃত স্মৃতিফলকটি।
বাড়িতে আর দশজন পরিবারের সদস্যের সঙ্গে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ঝুলত ‘খোকনে’র ছবি। আমাদের যৌথ পরিবার ছিল ধানমন্ডি ৭নং রোডের বাড়িটিতে। এমন একজন শহীদের প্রতি কোন স্মৃতিমুখরতা বা বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের ঘটা দেখিনি কখনো। আমি তাঁকে জানতাম আমার ছোট চাচা ‘খোকন’ হিসেবে। খোকন চাচা খুব সাহসী ছিলেন, খেলোয়াড় ছিলেন, অদম্য ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে তিনি রক্ষা করবেন বলে গেটের নিরাপত্তারক্ষীর বন্দুক নিয়ে অকুতোভয় নিজেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ব্যাস এতটুকুই আমাদের জানার মধ্যে ছিল। খোকন চাচা অবিবাহিত ছিলেন। মনে পড়ে ২৫ মার্চ আমার বাবা আহসানউল্লাহ আহমেদ আমাকে নিয়ে কিছু ফুল, আগরবাতি নিয়ে আজিমপুর গোরস্থানে যেতেন চাচার কবর জিয়ারত করতে। পরিবারে একমাত্র তিনিই শহীদ ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘৭১ এর দিনগুলি’ বাবা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। যা আমার ছোট্ট বয়সের মনোজগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। বইটি ছিল আমার সব সময়ের সঙ্গী, নিজে পড়ে, অন্যদেরও পড়াতাম, অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের একটি লাইব্রেরীও গড়ে তুললাম বাড়িতে। একদিন এক ২৫ মার্চ আমার দাদীকে বললাম, ‘দাদী আজ কি দিন জানেন? দাদী লতিফা খাতুন বলেছিলেন, ‘খোকনের মৃত্যু দিন’ আমি বললাম দিনটি শুধু মৃত্যুর নয়, অহঙ্কারের এক ঐতিহাসিক দিন। অথচ আপনাদের কোন প্রতিক্রিয়াই নেই। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘৭১ এর দিনগুলি’ দাদীকে পড়ে শুনাতে লাগলাম। মনে পড়ে, বারান্দায় বসে দাদীর চোখে অবিরল অশ ু ঝরেছিল। বললেন, ‘তুই আমাকে কি শোনালি’। সত্যি বলতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছিলেন আমার জীবনের এক মহানায়ক। এখনো আমার প্রিয়জনদের হাতে ‘৭১ এর দিনগুলি’ তুলে দেই পরম শ্রদ্ধায়। ’৭১ এর আরো অনেক বইও প্রিয়। মা, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী সব সময় মুক্তিযুদ্ধের বই ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। মা বলতেন, ‘৭১-কে প্রতিনিয়ত অস্তিত্বে ধারণ করো। মার্চের এই মহান মাসে মনে পড়ছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘৭১ এর দিনগুলি’র একটি পাতা থেকে, ‘বাংলাদেশকে ভারত স্বীকৃতি দিয়েছে। নয়াদিল্লী, ছয়ই ডিসেম্বর, এপিপি/রয়টার। ভারত আজ বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের খবরটার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম, বাংলাদেশ স্বাধীন বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন জাতি। চোখ দিয়ে টপটপ পানি পড়তে লাগল। রুমি এখন কোথায়? তাকে পাক আর্মি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে। ...স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল ...ওরা আজ কোথায়? ওরা কি জেনেছে পৃথিবীর অন্তত একটি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে/ যাদেরকে গাদ্দার বলে, কাফের বলে পাকিস্তানিরা পিঁপড়ের মতন পিষে মারছে, তাদেরকেই একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে পৃথিবীর অন্তত একটি দেশ? যদি ওরা সবাই শহীদ হয়ে থাকে, তাহলে কি ওদের আত্মা জানতে পেরেছে এই খরব? জেনে কি শান্তি পেয়েছে ওর আত্মা?’
মহান মুক্তিযুদ্ধের এমন অজস্র ঘটনা, স্মৃতি ছড়িয়ে আছে সারা বাংলায়। আমরা যেন তাদের স্মরণ করি। আমার ‘খোকন’ চাচা কখনো শহীদের মর্যাদা পাননি, বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে উন্মোচিত স্মৃতিফলকটি। এমন অজস্র শহীদের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে সারা দেশে, আমরা যেন তাদের খুঁজে ফিরি।
