‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা যা ভাবে তাই করে। হঠাত্ সিদ্ধান্তে দুই রাত এক দিনের এই ট্যুরে ঢাকা থেকেই বন্ধু জুটে গেল ১৪ জন। সিলেট আর সুনামগঞ্জ থেকে শামিল হলো আরও চারজন। সব মিলিয়ে আঠারো জন। ট্যুরের যাবতীয় আয়োজনের গুরু দায়িত্ব আমাকেই বহন করতে হয়। তাই বন্ধুদের আনন্দময় ভ্রমণ উপহার দেওয়ার জন্য আমার টেনশনটাও থাকে খানিকটা বেশি। তার উপর এবার সদস্য সংখ্যা বেশি। ঢাকা থেকে রাতের গাড়িতে চড়ে সকালে গিয়ে নামলাম সিলেট শহরের হুমায়ুন চত্বর। হোটেলে ফ্রেস হয়ে মাইক্রোতে করে সোজা জৈন্তাপুর উপজেলার সারিঘাট। বার শ টাকায় একটা ইঞ্জিন নৌকা ঠিক করা হলো একেবারে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত। সারি ঘাটে দাঁড়িয়েই বুঝতে বাকি রইল না যে আমরা এক অসাধারণ খালে ঘুরতে এসেছি। দোল দেওয়া বাতসে ছাইয়া নৌকা ভাসল জলে। শুরু হলো চির চেনা ভট-ভট শব্দ। নৌকার ভট-ভট শব্দ যদি না থাকত তাহলে হয়তো ভ্রমণ আরও আনন্দময় হতো। ভট-ভট শব্দকে কিবোর্ডে তোলা সুর মনে করে দে ছুটের দল লালাখালের বুকে ভেসে চলছে। অপরূপ সুন্দর নীলাভ জলের লালাখালের দু তীর যত্ন করে সাজিয়েছে প্রকৃতি। যতই ভিতর দিকে যাচ্ছি ততই মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে পড়ছি। অবাক বিস্ময়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখি। ইতোমধ্যে পলাশ ভাই ও হানিফের ‘বডি ডেন্স’ শুরু হয়ে গেছে সেই সঙ্গে মোস্তাকের অফুুরন্ত চুটকির (কৌতুক) ফুলঝুরি। আর এম এ কালাম নিজের ছবি একই ভঙ্গিমায় শতবার তুলতেও ভুল করেনি। লালাখালের চা ফ্যাক্টরির ঘাটে নৌকা ভিড়ল, চায়ের ফ্যাক্টরি পাশ কেটে যেতেই চোখ গিয়ে উঠল কপালে। এত সুন্দর চা বাগান সত্যিই আমরা সবাই অবিভূত! পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা বাগানটি যেন মুনাফার পাশাপাশি পর্যটকদের বিনোদনের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। চা বাগানে পালিত হাতির পিঠে চড়ে বেশ মজা করা হলো, মায়াময় চা বাগানটি প্রকৃতির বিস্ময় লালাখালকে করেছে আরও মায়াবী। নৌকা ভাসল এবার জিরো পয়েন্টের দিকে। সারিবদ্ধ দূরের পাহাড়গুলো যেন ভ্রমণ পিপাসুদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। নীল আসমানের রং আর লালাখালের জল মিলেমিশে একাকার। তাদের অপূর্ব মিতালিতে এক চমত্কার আবহ সৃষ্টি হয়েছে। সবুজে মোড়ানো প্রকৃতি যেন আরও উদার। পাথুরে লালাখাল ভ্রমণ শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমেই রোমাঞ্চকর। এবার ফেরার পালা।
নৌকার মাচাংয়ে বসে যখন আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলার দিকে তাকাই, তখন মনে পড়ে যায় কবি জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতার লাইনগুলো—বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি-তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর/অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে/চেয়ে দেখি ছাতার মতোন বড় পাতাটির নিচে/বসে আছে ভোরের দোয়েল পাখি।
যোগাযোগ :গাবতলী, ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস দিনে-রাতে ছেড়ে যায় সিলেটের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে সদস্য বুঝে মাইক্রো, গণপরিবহন অথবা সিএনজিতে জাফলং রোডের সারিঘাট যেতে হবে। এলাকাটি জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত। খরচপাতি জনপ্রতি দুই হাজার টাকা হলেই চলবে।
আরও কী কী দেখবেন :হযরত শাহ্জালাল (র.) ও হযরত শাহ্পরান (র.) মাজার শরীফ, বিমান বন্দর সড়কের পাশে দেশের প্রাচীনতম চা বাগান, রাতার গুল জলার বন, বিছানাকান্দির মায়াময় প্রকৃতি, খাদিম নগর অভয়ারণ্য এবং প্রকৃতি কন্যা জাফলংসহ আরও অনেক কিছু দেখার আছে।
ছবি :‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘ
