তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তিত প্রকাশভঙ্গিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৪, ২১:৫০
মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং সামাজিক মিডিয়ার যুগে আজকের তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশিই সমালোচিত। তরুণ মাত্রই আত্মকেন্দ্রিক, আবেগশূন্য, চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধুই নিজের স্থান প্রভৃতি প্রভৃতি। অনেকেরই অন্যতম প্রশ্ন—এই তরুণপ্রজন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আসলে কীভাবে দেখে? স্বাধীনতা-পরবর্তী জন্ম নেওয়া এই প্রজন্মের কাছে এটা কতটা গুরুত্ব বহন করে কিংবা আদৌ কোনো গুরুত্ব বহন করে কিনা? মুক্তিযুদ্ধকে যাঁরা খুব কাছে থেকে দেখেছেন তাঁদের অনেকেই আসলে তরুণ প্রজন্মের এই অধিকাংশ সময় অনলাইনে ডুবে থাকার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেন না। এভাবে এই প্রজন্ম গোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে কিনা এটিই তাদের মূল দুশ্চিন্তা। হ্যাঁ, বলতে দ্বিধা নেই যে আজকের এই প্রযুক্তিবান্ধব সমাজ তরুণদের নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে রেখেছে বৈকি! কিন্তু এই প্রযুক্তিই করেছে তাদের তথ্যসমৃদ্ধ; করেছে সংস্কারমুক্ত, আর পরিবর্তন এসেছে প্রকাশভঙ্গিতে। শাহবাগের প্রজন্মচত্বরে একসঙ্গে লাখো মানুষকে জড়ো করেছিল এই প্রযুক্তিবান্ধব তরুণরাই। কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের খবরে মুহূর্তেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ে ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার আর স্কাইপিতে। এ আন্দোলনের বিশালতার ফলেই আইন সংশোধন হয়ে রায়ের বিপক্ষে আপিলের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং অনেক নাটকীয়তার জন্ম দিয়ে অবশেষে কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে আন্দোলনের বিজয় সূচিত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তরুণপ্রজন্মকে তার জাতিগত ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভুলিয়ে দেয়নি, বরং ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। মুক্তবুদ্ধি চর্চায় আগ্রহ বাড়ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বলিউডের যশরাজ ফিল্মসের ‘গুণ্ডে’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এতে বাংলাদেশের জন্মকে দেখানো হয়েছে ভারত-পাকিস্তানের ১৩ দিনের যুদ্ধের ফল হিসেবে। আলী আব্বাস জাফর পরিচালিত ওই চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার পরপরই ব্লগ ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কয়লা মাফিয়াদের জীবন ঘিরে নির্মিত এই ছবিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করে তরুণ প্রজন্ম। এরই জেরে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দেয় চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা সংস্থা যশরাজ ফিল্মস। পুরো পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য লিবারেশন ’৭১ গেমটির বেটা ভার্সন আজ বের হয়েছে। কয়েকজন তরুণ গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও প্রোগ্রামারের তত্ত্বাবধানে ২০১২ সালে গঠিত হয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘টিম ৭১’। তারা লিবারেশন ’৭১ নামে আন্তর্জাতিক মানের একটি ফার্স্ট পারসন শ্যুটার গেম তৈরি করছেন। মুক্তিযুদ্ধকে সবার কাছে ছড়িয়ে দিতেই তরুণরা রাত জেগে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছেন সফলতার দিকে। আজ এই গেমটার পথচলা শুরু হয়েছে। ‘টিম ৭১’-এর প্রতিষ্ঠাতা ফরহাদ রাকিব জানান, এখনকার প্রজন্মের যেহেতু কম্পিউটার ও কম্পিউটার গেমসের প্রতি বেশি আগ্রহ, তাই তাদেরকে তাদের পছন্দের পদ্ধতিতেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য। এতে তারা আনন্দও পাবে, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতিগুলো অনুভব করতে পারবে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে আসলে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও জানতে পারবে। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু শুনেছে দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার কথা; জেনেছে কীভাবে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজকের প্রজন্মের প্রকাশভঙ্গিটা শুধু পরিবর্তন হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, তারা তাদের দেশের উত্পত্তির শেকড় নিয়ে চিন্তিত নয়। আজ হয়তো তারা দেশের জন্য তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করছে পোশাকের মধ্য দিয়ে, গানের মধ্য দিয়ে, বিজয় মিছিলের মধ্য দিয়ে কিংবা ফেসবুক, টুইটারে জাতীয় পতাকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের ছবি প্রকাশ করার মাধ্যমে। কিন্তু তারাই একদিন ভবিষ্যতের বাংলাদেশের যোগ্য কাণ্ডারি হিসেবে বিশ্ব দরবারে নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরবে। ঢাকা