গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে চোরাচালানের উদেশ্যে আনা সোনা উদ্ধারের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে- চোরাচালান হয়ে আসা এসব সোনা চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। এখানে বাংলাদেশকে শুধু রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারীরা। মূলত: সোনা আমদানির ওপর ভারত সরকার উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করায় সেখানকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সোনা চোরাচালানের আশ্রয় নিচ্ছে।
প্রসংগত: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত কয়েকমাস ধরে ক্রমাগত সোনার চালান ধরা পড়ছে। সাধারণত: সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিমানগুলোতে সোনা চোরাচালান হচ্ছে বেশি। গতকাল শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোনার যে চালানটি ধরা পড়েছে তা এ যাবত্কালের সবচেয়ে বড়। প্রায় ১০৫ কেজি সোনা ছিলো তাতে।
বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলদার আহমেদ সেলিম বলেন, বাংলাদেশে চোরাচালানের যত সোনা ধরা পড়ছে তার প্রায় সবগুলোর গন্তব্য ভারত। এখানে শুধু বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সোনা আমদানিতে ভারত সরকার কড়াকড়ি আরোপ করায় সেখানে চোরাচালানের ঘটনা বাড়ছে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতের চোরাকারবারীরা সোনা চোরাচালানের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যবহার করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি এবং শারজাহ থেকে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে আসেন তাদের ওপর ভর করেন চোরাকারবারীরা। বাংলাদেশে আসার পর সীমান্ত দিয়ে এসব সোনা চলে যায় প্রতিবেশি দেশগুলোতে। শুধু বাংলাদেশ নয়, নেপাল হয়েও ভারতে সোনা চোরাচালান হচ্ছে বলে দেশটির আইন-শৃংখলা বাহিনী মনে করছে।
ভারতের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) মতে, প্রতিদিন সাতশ কেজি সোনা চোরাচালান হয়ে ভারতে আসে। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। চোরাকারবারীরা তাদের কাজ সমাধা করতে অভিনব সব পদ্ধতি অবলম্বন করে। ভারতের শুল্ক গোয়েন্দারা বলছেন, ভারতে যে পরিমাণ সোনা চোরাচালান হয় তার অধিকাংশই হয় আকাশপথে। এক্ষেত্রে চোরাকারবারীরা আন্তর্জাতিক রুটের বিমানে করে ভারতের কোন এয়ারপোর্টে আসেন। পরে স্থানীয় একজন স্থানীয় যাত্রী ওই সোনা নিয়ে কোন রাজ্যে চলে যান। এক হিসেবে দেখা যায়, গতবছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতে সোনা চোরাচালান তিনশভাগ বেড়েছে।
লোভনীয় এই বস্তুর ওপর ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপ করায় ভারতে সোনা চোরাচালানের ঘটনা বাড়ছে। সৌখিন ভারতীয়দের কাছে সোনা এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো যে, এর আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারের কোষাগারে টান পড়ছিলো। এক হিসেবে দেখা যায়, সোনা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিলো ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলারে। এছাড়া গতবছরের মে মাসে ভারতে সোনা আমদানি হয়েছিলো এক লাখ ৬২ হাজার কেজি। শুল্ক বাড়ানোর পর নভেম্বর মাসে তা ১৯ হাজার নয়’শ কেজিতে নেমে আসে। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতে সোনাকে আর্থিক সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে প্রকাশ, ভারত সরকারও জানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে সোনা চোরাচালান হয়ে ভারতে ঢুকছে। ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং সিনিয়র বিজেপি নেতা যশবন্ত সিনহা ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, প্রতিবেশি দেশগুলো থেকে ভারতে সোনা চোরাচালান হচ্ছে। এক্ষেত্রে তিনি অবশ্য কোন দেশের নাম উল্লেখ করেননি।
