সমপ্রতি মিসরের একটি আদালত বিভিন্ন অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসির ৫২৯ জন সমর্থককে একযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়াছে। আদালতের দৃষ্টিতে তাহাদের বিরুদ্ধে আনীত পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্যকে হত্যা, জনসাধারণের উপর হামলা ও তাহাদের সম্পত্তি ধ্বংসসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হইয়াছে। এইখানে জনসাধারণ বলিতে আসলে বর্তমান সরকার সমর্থকদেরই বোঝানো হইয়াছে। মাত্র দুইটি শুনানির পর আদালত এই রায় দিয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। এই রায় নিয়া বিশ্ব জুড়িয়া আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ উঠিয়াছে। কোন কোন মানবাধিকার সংগঠন নিন্দা জানাইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও গত মঙ্গলবার হইতে আরও সাত শত জনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। এই ঘটনা আধুনিক মিসরের ইতিহাসে যে বৃহত্তম ‘গণমৃত্যুদণ্ড’ তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। ইহা দ্রুততম বিচারেরও একটি দৃষ্টান্ত। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা ইহাকে ‘আইনের পথ হইতে বিচ্যুতি’ হিসাবেও অভিহিত করিয়াছেন। আর ব্রাদারহুডের একজন মুখপাত্র এই ঘটনাকে সেনাপ্রধান আব্দুল্লাহ আল-সিসির নূতন স্বৈরতন্ত্র হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন।
মিসরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব আসলে আজও অক্ষুণ্ন। মিসর অনেকের নিকট ফেরাউনের দেশ হিসাবে পরিচিত। এইখানকার প্রাচীন ফারাও শাসকরা ছিলেন নিকৃষ্ট স্বৈরাচার। তাই রাতারাতি পরিস্থিতি বদলের কোন সুযোগ নাই। মিসরের ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, ১৯৫২ সালে রাজতন্ত্র উত্খাতের মধ্য দিয়া সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। সুদীর্ঘকাল ক্ষমতা কুক্ষিগত করিয়া রাখায় তাহারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কর্নেল জামাল আবদুল নাসেরের বিপ্লব ও আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গোটা আরব জাহানেই প্রভাব বিস্তার করে। তাহার দেখানো পথে আনোয়ার সাদাত ও হোসনি মোবারক রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। কিন্তু হোসনি মোবারকের কয়েক দশকের অপশাসনের কারণে জনসমর্থন তলানিতে গিয়া ঠেকে। এই কারণে সেইখানে পরিবর্তন অপরিহার্য হইয়া পড়ে। আরব বসন্তের হাত ধরিয়া এই পরিবর্তন আসিলেও তাহা নানা কারণে দীর্ঘস্থায়ী হয় নাই। দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও তাহা কোন কাজে আসে নাই। তাহার কারণ মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির অনেক ক্ষেত্রে সফলতা থাকিলেও তিনি প্রকৃত ক্ষমতার স্বাদ পাইতে অস্থির হইয়া পড়িয়াছিলেন। সেনাবাহিনী ৬১ বত্সর ধরিয়া যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করিয়া আসিতেছে তাহাতে সহসা ভাগ বসানো চাট্টিখানি কথা নহে। তিনি দ্রুত ইসলামিকরণের পদক্ষেপ নিতে গিয়া আন্তর্জাতিক মহলেরও বিরাগভাজন হন। তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদেগানের ন্যায় বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেন নাই। এমনকি তিউনিসিয়ার আল নাহদা পার্টি শত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়া টিকিয়া আছে। তবে মুরসির ব্যর্থতার পিছনে ভূ-রাজনীতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হইয়া দাঁড়ায়। এইখানে ইসরাইলবিরোধী শক্তির সহসা মাথাচাড়া দিয়া উঠা কঠিন বৈকি।
অবশ্য বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ। শুধু মিসরেই নহে, আরব বিশ্বের অনেক দেশেই ঐতিহ্যবাহী এই দলটির সহযোগী সংগঠন রহিয়াছে। তাহারা একদিন আরব জাহানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলিয়া আসিতে পারেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, তাহাদের উত্থান ঠেকাইতে বিপক্ষ শক্তিও বসিয়া থাকিবে না। গত বত্সর সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের পর সহস্রাধিক ব্যক্তি হত্যা ও ব্রাদারহুডের ষোল হাজার নেতা-কর্মীকে কারান্তরীণের মধ্যে তাহা প্রমাণিত হয়। উল্লেখ্য, ইহার আগেও হাসানুল বান্নাসহ ব্রাদারহুডের কয়েকজন শীর্ষনেতার ফাঁসি দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে মিসরে। এইবার যেহেতু সিসি প্রেসিডেন্ট পদে লড়াইয়ের মনস্থির করিয়াছেন, তাই বিরোধী মত দমনে তিনি আরও কঠোর হইতেছেন বলিয়া অনেকের অভিমত। তাহাছাড়া বর্তমান বিশ্বে ইসলামপন্থীদের দুর্দিন চলিতেছে। দক্ষিণ এশিয়াসহ সর্বত্র আজ তাহারা কোণঠাসা। সবকিছুই আজ তাহাদের প্রতিকুলে। এমতাবস্থায় মিসরে একযোগে অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হইয়া গেলে তাহাতেও বিস্মিত হইবার কিছু থাকিবে না। আমরা একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বের স্বপ্ন বরাবরই দেখিয়া থাকি। কিন্তু মানুষের অধিকাংশ স্বপ্নই যে অপূর্ণ থাকিয়া যায়, সেই কথা আজ কে না জানেন।
