মৌমাছি কথন

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৪, ২০:০২
আমরা প্রায় সবাই মধু খেতে খুব পছন্দ করি। ছোটবেলা থেকেই মধু দিয়ে নানা ধরনের বানানো খাবারও খাই। তবে মধু যতটাই পছন্দ করি মধু প্রস্তুতকারী মৌমাছি ততটাই ভয় পাই আমরা। মৌমাছির অজানা কিছু তথ্য নিয়ে আজকের ফিচারটি লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র মৌমাছি বা মধুমক্ষিকা বা মধুকর বোলতা এবং পিঁপড়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত মধু সংগ্রহকারী পতঙ্গবিশেষ। মধু ও মোম উত্পাদন এবং ফুলের পরাগায়ণের জন্য প্রসিদ্ধ। পৃথিবীতে ৯টি স্বীকৃত গোত্রের অধীনে প্রায় বিশ হাজার মৌমাছি প্রজাতি আছে, যদিও এর বেশিরভাগেরই কোনো বর্ণনা নেই এবং এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অ্যান্টার্কটিকা ব্যতীত পৃথিবীর সকল মহাদেশে যেখানেই পতঙ্গ-পরাগায়িত সপুষ্পক উদ্ভিদ আছে, সেখানেই মৌমাছি আছে। পৃথিবীতে মৌমাছির প্রায় বিশ হাজার প্রজাতি আছে। বাংলাদেশ ও ভারতে বেশ কয়েক প্রজাতির মৌমাছি দেখা যায়। মৌমাছি সত্যিই এক আশ্চর্য প্রাণী। এরা নিজেরাই বাড়ি তৈরি করে। এবং সেটাকে রীতিমতো প্রাসাদই বলা যায়। এই প্রাসাদের কিন্তু একটা নাম আছে। একে বলে মৌচাক। মৌমাছিরা এটি তৈরি করে শীত বা অত্যধিক গরম থেকে নিজেদের বাঁচাতে, খাবার জমা রাখতে এবং থাকার জন্য স্থায়ী আশ্রয় হিসেবে। এক একটি মৌচাকে প্রায় ২০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ পর্যন্ত মৌমাছি থাকে। আর এরা খুবই পরিশ্রমী, পরোপকারী ও সামাজিক প্রাণী। পৃথিবীতে প্রায় ২০,০০০ প্রজাতির মৌমাছি আছে। এদের কেউ একা থাকে আবার কেউ বা থাকে দলবদ্ধভাবে। কেউ প্রচুর মধু জমা করে আবার কেউ একেবারেই করে না। কেউ বা উদ্দাম, পোষ না মানা, ঘুরে বেড়ায় বনে-বাদাড়ে। আবার কেউ কেউ থাকে মানুষের পোষ মানে। কিছু কিছু প্রজাতি কিন্তু আছে, যাদেরকে মানুষ পোষ মানাতে পেরেছে। আরা এই পোষ মানা মৌমাছিদেরকে নিয়েই মৌচাষিরা তৈরি করে মৌ-খামার। বাজারের বেশিরভাগ মধুই কিন্তু আসে এসব খামার থেকে। অবাক ব্যাপার হচ্ছে এদের মধ্যেও মানুষের মতো শ্রেণীবিভাগ আছে। আছে একেক শ্রেণীর একেক ধরনের কাজ। মৌমাছিদের প্রধানত তিনটি শ্রেণী আছে—রানি মৌমাছি, রাজা মৌমাছি এবং কর্মী মৌমাছি। একটি মৌচাকে এতগুলো মৌমাছির মধ্যে রানি থাকে কেবলমাত্র একটি। আর রাজা! মৌমাছিদের রাজা থাকে কয়েক শ, আর বাকিরা সব কর্মী। রানি একজন হলেও সেই কিন্তু মৌচাকের সর্বময় কর্ত্রী। সবাই তার কথা মেনে চলে। আকারেও এরা অন্যদের চেয়ে বড় হয়, প্রায় ১.৮ থেকে ২.২ সেন্টিমিটার। ডিম ফুটে বেরও হয় তাড়াতাড়ি। মাত্র ১৬ দিনের মাথায় পূর্ণাঙ্গ রানি ডিম থেকে বের হয়ে আসে। রানি মৌমাছির কাজ হচ্ছে মৌচাকের বাকি কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা আর ডিম পাড়া। প্রতিদিন এরা প্রায় ১০০০টিরও বেশি ডিম পেড়ে থাকে। মজার ব্যাপার হলো রানি ডিম পাড়ে হুল দিয়ে। রক বি বা পাথুরে মৌমাছি (এপিস ডর্সাটা) :এরা ভালো মধু সংগ্রাহক এবং এদের প্রতি কোলোনি থেকে গড়ে ৫০-৮০ কেজি ফলন পাওয়া যায়। লিটল বি বা ক্ষুদে মৌমাছি (এপিস ফ্লোরিয়া) :এরা খুব কম মধু উত্পন্ন করে এবং প্রতি কোলোনি থেকে প্রায় ২০০-৯০০ গ্রাম মধু পাওয়া যায়। ইন্ডিয়ান বি বা ভারতীয় মৌমাছি (এপিস সেরানা ইন্ডিকা) :এরা বছরে প্রতি কোলোনি থেকে গড়ে ৬-৮ কেজি মধু দেয়। ইউরোপিয়ান বি বা ইউরোপীয় মৌমাছি (এপিস মেলিফ্লেরা) :প্রতি কোলোনি থেকে গড়ে ২৫-৪০ কেজি মধু পাওয়া যায়। এগুলো ছাড়াও কেরলে আর একটি প্রজাতি পাওয়া যায় যারা ‘হুলবিহীন মৌমাছি’ নামে পরিচিত। এরা আদৌ হুলবিহীন নয়, প্রকৃতপক্ষে এদের হুল পূর্ণ বিকশিত হয় না। তবে এরা খুব ভালো পরাগসংযোজক। এরা বছরে ৩০০-৪০০ গ্রাম মধু উত্পাদন করে। মৌমাছির হুল ফুটানো বিষ খুবই যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু মৌমাছির হুল থেকে সংগৃহীত বিষ রোগ নিরাময়ের উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে বলে গবেষকরা দাবি করেছেন। গেঁটে বাতজনিত ব্যথা নিরাময়ে প্রদাহ নিরোধক হিসেবে কাজ করে মৌমাছির বিষ। তাদের মতে, মৌমাছির বিষ প্রয়োগে বাতের চিকিত্সা নতুন ধারণা নয়। কোনো কোনো ক্লিনিকে মৌমাছির হুল ফুটিয়ে বাতের চিকিত্সা করা হয়। পরাগায়ণ ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় মৌমাছিরা তাদের পা এবং বুকের লোমে ফুলের অসংখ্য পরাগরেণু বয়ে বেড়ায়। এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে পড়লে পরাগায়ণ ঘটে, যার ফলে উত্পন্ন হয় ফল। এভাবে মৌমাছিরা পরাগায়ণের মাধ্যমে হিসেবে কাজ করে ফল ও ফসলের উত্পাদন বাড়ায়। টুকিটাকি  ৫০০ গ্রাম মধু তৈরি করতে মৌমাছির ২ মিলিয়ন ফুলের দরকার হয়।  এই একই পরিমাণ মধু তৈরি করতে মৌমাছির ভ্রমণ করতে হয় ৯০,০০০ কিলোমিটার।  মৌমাছি প্রতি ঘণ্টাঢ ৮ কিলোমিটার উড়তে পারে।  শ্রমিক মৌমাছি গড়পরতায় তার সারা জীবনে অর্ধেক চা চামচের সমপরিমাণ মধু তৈরি করতে পারে।  পুরো পৃথিবী একবার ঘুরে আসতে মৌমাছির জন্য ২ চা চামচ মধুই জ্বালানি হিসেবে যথেষ্ট।  মধু সংগ্রহের পরিভ্রমণে যেকোনো একটি মৌমাছি ৫০ থেকে ১০০টি ফুলে বসে।  মৌমাছিরা ১০ থেকে ২০ মিলিয়ন বছর আগে থেকেই মধু তৈরি করছে।