গত বছরের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বহুতল ভবন রানা প্লাজা ধসে এক হাজার একশ’র বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হন। সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর মানবিক বিপর্যয়ের ছবি উঠে আসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। মর্মান্তিক এই ঘটনা গোটা বিশ্ববাসীকে থমকে দেয়। সম্প্রতি সেই ছবিগুলো ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতা-২০১৪ আয়োজনে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে নেয়। এই প্রতিযোগিতায় একক আলোকচিত্র ক্যাটাগরিতে তৃতীয় স্থান জিতে নেন আলোকচিত্রী তাসলিমা আক্তার। এবং একই প্রতিযোগিতায় আলোকচিত্র কাহিনী ক্যাটাগরিতে তৃতীয় স্থানে অর্জন করেন আরেক ফটোসাংবাদিক রাহুল তালুকদার। সফল এই দুই ফটোগ্রাফারকে নিয়ে এক আড্ডায় উঠে আসে তাদের নানা অভিজ্ঞতা ও ভাবনার কথা। আড্ডাটি নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
প্রতিদিন সকালে সংবাদপত্রে প্রকাশিত অনেক ছবিতেই আমাদের চোখ আটকে যায়, মন বিমোহিত হয়। ছবি দেখেই আগ্রহ বেড়ে যায় সংশ্লিষ্ট খবরের প্রতি। প্রেসের সেই ছবিগুলো যেমন আমাদের আনন্দ দেয়, উত্সাহ দেয়, তেমনি কখনোবা দুঃখবোধ জাগায়। করুণ ছবিগুলো দেখে আমাদের ঘুমন্ত বিবেক জেগে উঠে! অনেক কথা দিয়েও যেখানে একটি বিষয় প্রকাশ করা যায় না, সেখানে কেবল একটি ছবি বা স্থিরচিত্র দিয়েই অনায়াসে অনেক কিছু বলে ফেলা যায়। প্রতি বছর ৯টি ক্যাটাগরিতে ২৫টি দেশের মোট ৫৩ আলোকচিত্রীকে পুরস্কৃত করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলোচিত্র বিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো। ১৯৫৫ সালে আমস্টার্ডামে যাত্রা শুরু করে আলোকচিত্র ও ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় অবদান রাখার জন্য পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো। এবারের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেছেন দুই বাংলাদেশি আলোকচিত্রী। নেদারল্যান্ডসের আমস্টার্ডামে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো-২০১৪-এর ফলাফল ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ড। এতে প্রথম নারী হিসেবে প্রেস ফটোর প্রতিযোগিতায় সংবাদভিত্তিক তালিকায় একক আলোকচিত্র ক্যাটারিতে তৃতীয় হয়েছেন বিপ্লবী নারী সংহতির সভাপতি ও বামপন্থী সংগঠন গণসংহতি আন্দোলনের সদস্য ও আলোকচিত্রবিষয়ক প্রতিষ্ঠান পাঠশালার শিক্ষক তাসলিমা আক্তার। একই প্রতিযোগিতায় আলোকচিত্র কাহিনী ক্যাটাগরিতে তৃতীয় হয়েছেন আরেক ফটোসাংবাদিক রাহুল তালুকদার। রাহুল ‘বাংলাদেশ সংবাদ ৭১’-নামে একটি ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদপত্রে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করছেন। তাসলিমার পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিটির শিরোনাম ‘ফাইনাল এমব্রেস’ বা ‘শেষ আলিঙ্গন’। ছবিটি টাইম ম্যাগাজিনের ২০১৩ সালের সেরা দশ ছবির তালিকায় ছিল। শুরুতেই এ প্রসঙ্গে জানতে চাই তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘যে ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রেস বা টাইম ম্যাগাজিনে স্থান পেয়েছে সেই ছবিটি তোলার মুহূর্ত আমার জন্য কোনোভাবেই আনন্দের ছিল না। রানা প্লাজা ধসে হাজারো শ্রমিক মারা যান, তাদের মধ্যে ওই দুজনও ছিলেন। যারা বেঁচে থাকার সব চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেননি। আমার ছবি যদি বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন পরিবর্তনে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে তাহলে সেটাই এসব পুরস্কারের চেয়ে অনেক বড় প্রাপ্তি হবে আমার জন্য।’ ওই ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে তাসলিমা বলেন, ‘ঘটনার ওই দিন সারাদিন আমি ঘটনাস্থলেই ছিলাম। দেখছিলাম রানা প্লাজা ঘিরে আহত আর স্বজনদের আতঙ্ক ভরা চোখ, শ্রমিকের লাশ আর উদ্ধারকর্মীদের তত্পরতা। এসব দেখতে দেখতে যখন মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত বোধ করছি, ঠিক সেই সময় এই দুটি লাশের মুখোমুখি হই। ২৫ এপ্রিল দিবাগত রাত প্রায় দুটো। ভবনের পেছনের একটা অংশে আটকে পড়েছিল ওই দুজন মানুষ। তাদের শরীরের নিচের অংশ ছিল ধ্বংসস্তূপের ভেতর। মৃত পুরুষটির চোখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে অশ্রুর মতো। প্রথমে দেখেই আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হলো এ যেন পরস্পরের খুব চেনা, আপন কেউ। শেষ মুহূর্তে নিজের প্রিয় প্রাণকে বাঁচাতে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি ওদের জীবন। ওদের স্বপ্ন। যতবার ওই ছবির দিকে তাকাই ততবার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আরও শত শত লাশের মাঝে এই দুই জনও যেন আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’ আলোকচিত্র কাহিনী ক্যাটাগরিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত রাহুল তালুকদারের ফটো সিরিজের নাম ‘কলাপ্স অব রানা প্লাজা’ বা রানা প্লাজা ধস। নিজের ফটোগ্রাফির শুরুটা সম্পর্কে রাহুল বলেন, ‘আমি ফটোগ্রাফি শুরু করি মূলত ২০১০ সাল থেকে। সে সময় নেহাতই শখের বশে ছবি তুলতাম। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ফটোগ্রাফি বিষয়ে আরও গভীরভাবে জানতে ও শিখতে ফটোগ্রাফি স্কুল পাঠশালায় ভর্তি হই। বর্তমানে আমি পাঠশালার দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ-এর শিক্ষার্থী ছিলাম। পরবর্তীতে ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ বেড়ে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিলাম এ বিষয়টিকেই পড়াশোনা ও পেশা হিসেবে নেবো। আমি মনে করি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে কার্যকর টার্নিং পয়েন্ট।’ রাহুলের ছবির অন্যতম বিষয়বস্তু হলো মানুষ ও সময়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে সব স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, সেই মুহূর্ত বা ঘটনাগুলো ছবির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে তিনি ফটোগ্রাফি শুরু করেন। তার মতে, ওয়ার্ল্ড প্রেস পুরস্কার তার জীবনের অনেক বড় একটি প্রাপ্তি। এটিই তার ফটোগ্রাফির প্রথম আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি। এই পুরস্কার তাকে ভবিষ্যতে আরও কাজ করতে উত্সাহ যোগাবে বলে তিনি মনে করেন। তাসলিমা আক্তার একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করছেন। তার শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় ফটোগ্রাফি বিষয়ে আগ্রহ ছিল কিন্তু কখনও ভাবিনি সিরিয়াসলি ফটোগ্রাফি করব। বিশ্ববিদ্যালয় পা দিয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হই। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য হই এবং পরবর্তীতে কাজের ধারাবাহিকতায় ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ওই সময়েও সুযোগ পেলে ছবি তুলতাম। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ থেকে মাস্টার্স এবং এমফিল শেষে আমি নারী সংগঠন নারী সংহতিতে যোগ দিই। এরপর ২০০৭-এ পাঠশালায় ১ মাসের একটা বেসিক কোর্স করি। ২০০৮ সালে দেশে যখন সামরিক শাসন চলছে, তখন মিছিল সভা সমিতির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ওই সময়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই পাঠশালায় আমি আরও কিছু সময় ফটোগ্রাফি শিখব। এভাবে পুরো ৩ বছরের কোর্স করা হয়। ইতোমধ্যে আমি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হই। বর্তমানে আমি নারী সংহতির সহ-সমন্বয়ক এবং গার্মেন্টস সংহতির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছি। আর পাঠশালা সাউথ এশিয়ান একাডেমিতে শিক্ষকতা করছি।’ এরই ফাঁকে রাহুলের উল্লেখ্যযোগ্য কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি চেষ্টা করি অনেকগুলো ছবির মাধ্যমে একটি গল্প বলার। আমার ফটোগ্রাফি মূলত শুরু স্ট্রিট ফটোগ্রাফির মধ্য দিয়ে। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির মাধ্যমে আমি ঢাকার রাস্তায় মানুষের অদ্ভুত কার্যকলাপ ও ব্যস্ততা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এটা আমার দীর্ঘ মেয়াদি কাজের মধ্যে একটি। এছাড়া শাহবাগ আন্দোলন, রানা প্লাজা ধস ও জাফলংয়ের পাথর উত্তোলনের উপর কাজ করেছি। রানা প্লাজা ধসে আহত ও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদেরকে নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি কাজ করার ইচ্ছা আছে।’ পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি প্রসঙ্গে রাহুল বলেন, ‘আমার ছবির গল্পের শিরোনাম ‘কলাপস অব রানা প্লাজা’। আমি চেষ্টা করেছি ১১টি ছবির মাধ্যমে রানা প্লাজা ধসের ভয়াবহতা তুলে ধরতে। আমি সেখানে দুর্ঘটনার প্রথম দিন থেকে উদ্ধার প্রক্রিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই কাজ করেছি। নতুন প্রজন্মের যারা ফটোগ্রাফিতে নিজেদের নিয়োজিত করেছে তাদের মূল্যায়নে তাসলিমা বলেন, ‘পেশা হিসেবে অনেকেই এখন ফটোগ্রাফিকে বেছে নিচ্ছেন। আলোকচিত্রের মাধ্যমে আলোকচিত্রী নিজের অবস্থান, মত, চিন্তা এবং প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটাতে পারেন। অনেকেই সমাজের নানা দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টরি করছেন; যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের মানুষের সংকট, শক্তি, সংগ্রাম, সংকটের কারণ এসবই ছবির মাধ্যমে তুলে আনা সম্ভব হচ্ছে। আবার উল্টো ঘটনাও ঘটছে। তবে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, এমন বিষয়ের ছবি কেন তুলতে হবে যার সাথে নিজের ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই? অনেক সময় আমরা নিজেকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে যাই কেন এই ছবি তুলছি। আলোকচিত্রী হিসেবে যদি আমরা নিজের চিন্তা এবং অবস্থান কাজের মধ্যে প্রকাশ করতে না পারি তাহলে নিজের কাজও নিজের হয়ে ওঠে না, সে কাজ পরের হয় আর নিজে হয়ে উঠি ভাড়াটে। আমি বলব এটা আলোকচিত্রীদের দোষ নয়, বরং তারা একটা ফাঁদের মধ্যে পড়ে আছেন। যার থেকে বের হওয়া খুব জরুরি।’
ভবিষ্যত্ নিয়ে রাহুলের তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। আরও কাজ করে যেতে চান ও ফটোগ্রাফির সাথে থাকতে চান তিনি। তাসলিমা আক্তার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা, মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়নের সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন। এই কাজই আরও সংগঠিতভাবে করাটাই তার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা। আর একজন আলোকচিত্রী হিসেবে স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশে আলোকচিত্রে এমন ধারা গড়ে উঠবে যেখানে ছবি হয়ে উঠবে আন্দোলনের হাতিয়ার।
