ফিন্যান্সিয়াল প্রধান

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২১:২৬
জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে বেড়েছে প্রতিযোগিতা। এই সম্প্রসারণের ফলে লেনদেনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে জটিলতা। ফলে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ফিন্যান্সিয়াল কর্মকর্তা যেকোনো ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রজন্মও আগ্রহী হয়ে উঠছে এই পেশায় ক্যারিয়ার গঠনে। একজন ফিন্যান্সিয়াল প্রফেশনাল একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজনেস প্ল্যান ডেভেলপার বা ডিসিশন-মেকিং অথরিটি। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশায় নিজেদের মেধা-মননকে যোগ করে কাজ করতে হয়। তাই এবার এ প্রজন্মের মেধাবী কয়েকজন ফিন্যান্সিয়াল কর্মকর্তাদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র এইচএম জিয়াউল হক খান ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আইডিএলসি তারুণ্য পার করে এসেছেন জিয়াউল হক খান, তবুও সময়ের সাথে নিজের সাফল্যের ধারাটা ধরে রেখেছেন ঠিকই। দেশের শীর্ষ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে রয়েছেন তিনি। অর্থনীতি মানেই কেবল টাকার হিসাব-নিকাশ আর ফাইলপত্রের হাজারো রেখচিত্র নয়, স্বনির্ভর অর্থনীতি আমাদের সুখ ও সমৃদ্ধির পথে পরিচায়ক। আইডিএলসির অজস্র উপকারভোগীর নিত্য সুখের গল্পের পেছনে জড়িতদের একজন এই জিয়াউল হক খান। মেধাবী বলে শিক্ষকরা চাইতেন ডাক্তার হবেন ছোট্ট প্রিন্স। এ নামেই জিয়াউল হক খানকে পরিবারের সবাই আদর করে ডাকেন এখনও। তবে বড় ভাই চাইতেন ভাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হবেন। সেই লক্ষ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞানে ভর্তি হলেন। সেখান থেকে অনার্স-মাস্টার্স করে তিনি শুরু করেন সিএ বিষয়ে পড়াশোনা। কোর্সটি তিনি খুব কম সময়েই শেষ করেন কেপিএমজি থেকে। আর বলাই বাহুল্য, আন্তরিক চেষ্টাতেই তিনি মেরিট অ্যাওয়ার্ডও পান। কিছুদিন তিনি ওই প্রতিষ্ঠানেই এবং ইলেকট্রিক কোম্পানিতে চাকরি করে যোগ দেন আইডিএলসি-তে। ধাপে ধাপে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে এখন তিনি এই সংস্থার একজন ডিএমডি। ব্যবস্থাপনার বিষয়টা আরও রপ্ত করতে সেরে ফেলেন এমবিএ, সব মিলিয়ে সাফল্যের পথ ধরে এগোতে খুব একটা বিপত্তি হয়নি তার। এখন এই পেশায় কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে জিয়াউল হক খান বলেন, ‘কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্যই চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্টদের দরকার হচ্ছে। কাজেই প্রজন্ম যতই এগিয়ে আসবে, নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে এই পেশা। আট ভাইবোনের পরিবারে সবচেয়ে ছোট ছিলেন তিনি। সবার ভালোবাসা নিয়েই টাঙ্গাইলে কেটেছে তার শৈশবের দিনগুলো। এরপর থেকেই ঢাকার এই জীবনে বন্ধুবান্ধব আর পরিবারকে নিয়ে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন। স্ত্রী ইশরাত জাহান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। দুই সন্তান শারিকা আর শাফওয়াতকে নিয়েই তার নানা স্বপ্ন। সামনের দিনগুলোতে নিজের ক্যারিয়ারে আরও ভালো কিছু করতে চান। দিকনির্দেশনা দিয়ে এ ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আরও এগিয়ে নেবেন তিনি সামনের দিকে। সেই শুভকামনা। এইচএম জিয়াউল হক খান ডাকনাম :প্রিন্স জন্ম তারিখ ও স্থান :২২ সেপ্টেম্বর, টাঙ্গাইল মায়ের নাম :হামিদা খানম বাবার নাম :আজিজুল হক খান প্রথম স্কুল :যদুনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় উক্তি :Coming together is a beginning; keeping together is progress; working together is success... প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :মেধা মনন ও যোগ্যতার সমন্বয়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ০০০০ মোহাম্মদ আলতাফুজ্জামান ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এসইএএফ (স্মল এন্টারপ্রাইজ অ্যাসিস্টেন্স ফান্ডস) বেড়ে ওঠা পদ্মাপাড় রাজশাহীতে। সেখানেই কেটেছে স্কুল কলেজের উচ্ছল দিনগুলো। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পর চলে যান ভারতের আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে রসায়নে স্নাতক শেষ করে দেশে ফিরে এমবিএ করেন ফিন্যান্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোতেই কাজের দারুণ সুযোগ ছিল তার। মন সেদিকে টানেনি, চেয়েছিলেন ফিন্যান্সের পাঠ্যবই থেকে বেরিয়ে বাস্তবিক প্রয়োগ কাছ থেকে দেখবেন। সেইরকম কিছু স্বপ্ন সামনে রেখেই যোগ দিয়েছিলেন গ্রামীণ ফান্ডে। বিকল্প বিনিয়োগকে প্রণোদনা দেওয়াই তার কাজ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজ তিনি বিশ্বের প্রথম কাতারে থাকা ভেনচার ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান সিফের (স্মল এন্টারপ্রাইজ অ্যাসিস্টেন্স ফান্ডস) বাংলাদেশ কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একইসাথে শখের বসে শুরু করলেও গুগল ম্যাপিংয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান নির্ণয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন। আলতাফুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বিকাশমান এসএমই খাত দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে অনেকটা বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া পড়েছে তেমন প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই এসএমই খাতকে অবহেলিত এবং গুরুত্বহীন অবস্থানে রাখার কথা ভাবা উচিত নয়। বরং এটাকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। এসএমই খাত উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বেসরকারি খাতের দ্রুত বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে সাধারণত। দেশের বিনিয়োগ খাতকে আরও বেশি অগ্রসর করতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকে উত্সাহিত করার কথা উল্লেখ করে আলতাফুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগ এবং বিভিন্ন মহলের যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকলেও এসএমই খাতকে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এটা শুভ সংবাদ হলেও বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নীতিমালার কারণে অনেকেই সবকিছু গুছিয়ে আনার পরও প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না।’ আর এইসব উদ্যোক্তাদের পাশেই রয়েছে আলতাফুজ্জামানের মতো মানুষেরা। তিনি মনে করেন, অর্থের পেছনে ছোটাই কখনও ক্যারিয়ার গড়ে দিতে পারে না। ভালোবেসে কিছু করে গেলে সেটার সফলতা আসবেই। আর এটা যে শুধুই কথার খাতিরে কথা নয়, তার উদাহরণ তিনিই। ব্যক্তিজীবনে একমাত্র সন্তান ওয়াফিকে নিয়েই কেটে যায় তার সারাদিন। স্ত্রী রাবেয়া বেগম গৃহিণী, তার সব কাজের সারথী। মোহাম্মদ আলতাফুজ্জামান ডাকনাম :জামান জন্মতারিখ ও স্থান :৮ আগস্ট, রাজশাহী মায়ের নাম :শিরীন জামান বাবার নাম :আরশাদ উজ জামান প্রথম স্কুল :রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় পোশাক :জিন্স-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :নেট ব্রাউজিং করে সাফল্যের সংজ্ঞা :আত্মতৃপ্তি ০০০০ মো. নাজমুল ইসলাম হেড অব ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস, গ্রামীণ টেলিকম অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বাবাকে হারিয়ে রীতিমতো স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কাটার মতো এক পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। জীবনে বিপথগামী হওয়ার অনেক হাতছানিকে অগ্রাহ্য করে শুধু নিজেকে একজন ভালো ছাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি । খুব বেশি ছিল না তার চাওয়া, তবুও নিজের প্রচেষ্টায় পৌঁছেছেন তার প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শীর্ষ পদে। নিজেকে দক্ষ প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে তৈরি করার জন্য আইসি এমএবি-তে ভর্তি হন তিনি। আর পাশাপাশি করেছেন চাকরি। একজন হিসাবরক্ষক হিসেবে যোগদান করে তিনি সেই একই প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগের প্রধান হয়েছেন। বিনয়ী আর হাস্যজ্জ্বোল এই মানুষটার নাম নাজমুল ইসলাম, তিনি জানিয়েছেন তার সংগ্রামী জীবনের গল্প। কাজের অনেক সুযোগ এই পেশায় উল্লেখ করে নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে পেশা হিসেবে এটাকে নেওয়ার জন্য পরিধি ব্যাপক। দেশে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ যত বাড়বে ততই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং এই ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে দক্ষ হিসাব রক্ষকের। গ্রামীণ টেলিকমে ১৯৯৭ সালে অফিসার পদে যোগদান করে বর্তমানে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে বহাল রয়েছেন তিনি। হেড অব ফিন্যান্স ও কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন সেই সাথে। আর্থিক কার্যক্রমের মনিটরিং, প্ল্যানিং, অর্গানাইজ এবং কোঅর্ডিনেট করা, বাজেট প্রণয়ন ও তা রিভিউ করা ছাড়াও একাধিক নীতিনির্ধারণী বিষয়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই প্রজন্মকে অহেতুক কর্মস্থল পরিবর্তন না করে মন দিয়ে ভালো জায়গাতেই কাজ করার পরামর্শ দিলেন তিনি, এতে ধারাবাহিকতা থাকে বলে মত তার। মো. নাজমুল ইসলামের শৈশব কেটেছে ঢাকার তেজগাঁও, সিভিল অ্যাভিয়েশনের স্টাফ কলোনিতে। বাবা সিভিল অ্যাভিয়েশনে চাকরিরত ছিলেন। বাবাকে হারানোর পর মা’ই তাদেরকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। নাজমুল ইসলামের স্ত্রী সাবেরা রূবাইয়া এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজের প্রাণিবিদ্যার প্রভাষক। তাদের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে নাযিফ মুহাম্মদ একই কলেজের ৭ম শ্রেণীতে পড়ছে। ছোট ছেলে নুসাইর মুহাম্মদ কেবল স্কুল শুরু করেছে। সত্ ও নিষ্ঠাবান একজন কর্মকর্তা হিসেবে নাজমুল ইসলাম নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, সেই পথ খুব সহজ ছিল না। শত ব্যস্ততার মাঝে দিনশেষে ঘরে ফিরে স্বপ্ন দেখেন তার ভবিষ্যত্ প্রজন্ম বাবা-মায়ের আদর্শে লালিত হবে, এর বেশি চাওয়ার নেই তার। মো. নাজমুল ইসলাম ডাকনাম :ঝন্টু জন্মতারিখ ও স্থান :২৩ নভেম্বর, ঢাকা মায়ের নাম :রওশন আরা বেগম বাবার নাম :মরহুম একেএম আবদুল মতিন প্রথম স্কুল :সিভিল অ্যাভিয়েশন স্টাফ ওয়েল ফেয়ার হাইস্কুল তেজগাঁও, ঢাকা। প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা প্রিয় উক্তি :মানুষের মনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো সম্মান পাওয়া। (মার্জোরি উইলসন) প্রিয় পোশাক :জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :পড়াশোনা করে সাফল্যের সংজ্ঞা :দ্বিধাহীনভাবে পজিটিভ মনোভাব নিয়ে সত্ সাহসের দ্বারা সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব।