লন্ডনের ভাড়া করা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে ৮ মাস বয়সী ছেলে ওয়াতানকে নিয়ে খেলছিলেন মা জেসি নজর। ছেলেকে বারবার শূন্যে ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন আর ধরে ফেলে আদরে আদরে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন ছোট্ট সোনামণিকে। ওয়াতানও মজা পেয়ে খিলখিল করে হাসছিল। মা-ছেলের এই খুনসুটি দেখে মনে হতে পারে কত সুখি এরা। কিন্তু এই সুখের অন্তরালে রয়েছে বিষাদের কালো ছায়া। মাকে কাছে পেলেও বাবার স্নেহ-আদর থেকে বঞ্চিত ওয়াতান। আর জেসিও বঞ্চিত স্বামীর সান্নিধ্য থেকে। ব্রিটিশ অভিবাসী আইনের খড়গে পড়ে জেসির ফিলিস্তিনি স্বামী গসন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন স্ত্রী-পুত্রের কাছ থেকে। তাকে নিজ দেশে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। বলে দিয়েছে, গসন কেবল স্ত্রী-সন্তানকে দেখতে কিংবা তাদের সাথে কথা বলতে পারবে কেবল ইন্টারনেটের মাধ্যমে!
ব্রিটিশ নারী জেসি কয়েক বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন গসনকে। গসন তখন লন্ডনে ছোট খাট কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সন্তানের জন্মের কয়েক মাস পরই তাদের কপালে নেমে আসে দুর্ভোগের যাঁতাকল। ব্রিটিশ অভিবাসী আইনে সংযোজিত হয় এক নিষ্ঠুর নিয়ম। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটেনের কোন নাগরিক ইইএ (ইউরোপিয়ান ইকোনমিক এরিয়া)’র বাইরের দেশের কাউকে বিয়ে করতে চাইলে তার (ব্রিটিশ নাগরিক) বার্ষিক আয় ১৮ হাজার ৬শ’ পাউন্ডের (প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা) বেশি হতে হবে। আর বিয়ের দণ্ড হিসেবে সরকারকে এককালীন প্রদান করতে হবে ২২ হাজার ৪শ’ পাউন্ড (প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা)। শুধু তাই নয়, ঐ দম্পতির প্রত্যেক সন্তানের জন্য সরকারকে ২ হাজার ৪শ’ পাউন্ড (৩ লক্ষ টাকা) অতিরিক্ত দিতে হবে।
ব্রিটিশ অভিবাসী আইনের এত কড়াকড়ি সহ্য করতে পারেননি অনেকেই। অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিকের পক্ষেই বছরে ১৮ হাজার পাউন্ডের উপর আয় করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে বেড়ে যাচ্ছে স্বামী-স্ত্রী-সন্তান বিচ্ছিন্ন পরিবারের সংখ্যা। জেসির মতো অনেককেই বিচ্ছিন্ন হতে হয় স্বামী বা স্ত্রীর কাছ থেকে। সন্তানও বেড়ে উঠছে একজন কেয়ারটেকারের অধীনে। জেসি বলেন, “তুমি কিভাবে সন্তানকে বোঝাবে যে তার বাবা এখানে থাকতে পারবেন না যেহেতু তিনি এদেশের নাগরিক নন, যেখানে সে দেখছে তার বন্ধুদের বাবা তাদের সঙ্গেই আছেন!” জেসির স্বামী ফিলিস্তিনি বলে তার জন্য বিভিন্ন দেশে যাবার ক্ষেত্রে এমনিতেই সমস্যার অন্ত নেই, আর নতুন ব্রিটিশ অভিবাসী আইনের কারণে তার পক্ষে ব্রিটেনে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলাফল- স্বদেশে প্রত্যাবর্তন। তবে কেবল ফিলিস্তিন নয়, কলম্বিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ ইইএ’র বাইরের যে কোন দেশের নাগরিককেই নতুন আইনের খড়গে পড়তে হচ্ছে।
অনেকের মতে, আসলে এ সবই ব্রিটেনের অভিবাসী নিরুত্সাহিতকরণ প্রক্রিয়ার অংশবিশেষ। ব্রিটেনের রাজনীতিতে অভিবাসী ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেভিড ক্যামেরনের কনজারভেটিভ নেতৃত্বাধীন সরকার অভিবাসী ইস্যুতে জনপ্রিয় বিরোধী দল ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির (ইউকেইপি) প্রবল হুমকির মুখে রয়েছে। নির্বাচনের আগে তারা সারাক্ষণ সরকারের কানের কাছে অভিবাসী বিরোধী ড্রাম বাজিয়েই চলেছে। আর ইউরোপে নির্বাচনের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। আগামী মে’তেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা ২০১৫ সাল নাগাদ ব্রিটেনে অভিবাসীর সংখ্যা কয়েক লাখ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দার মুখে কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা কতদিন বলবত্ রাখা যাবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান তারা। বিশেষ করে শ্রম বাজার যেখানে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। কাজের অভাবে বর্তমানে ২৩ লক্ষ ব্রিটিশ নাগরিক বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। আর এর প্রভাব এসে পড়েছে নতুন অভিবাসী আইনে।
নতুন অভিবাসী আইনে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে ব্রিটেনে স্বামী-সন্তানসহ থাকার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। এদেরই একজন পেপোসি (২৬)। তিনি জানালেন তার দুঃখ বেদনার কথা। পেপোসি বলেন, “নতুন আইনের কারণে ২০১২ সাল থেকে আমি আমার আলবেনীয় স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। আমার এখন সন্দেহ জাগে যে অন্য দম্পতিদের মতো সুখে থাকার অধিকার আমার আছে কিনা। সত্যিকারের বিবাহিত জীবন কেমন আমি তাও জানি না। কারণ আমি অল্প ক’দিন মাত্র স্বামীর সংসার করতে পেরেছি। আমি অন্য দেশেও যেতে চাই না। কেন যাব? ভালোবেসে কাউকে বিয়ে করেছি সেটাই কী আমার অপরাধ? কয়েদীদেরও অধিকার আছে প্রিয়জনের সাথে মাসে অন্তত দু’বার সাক্ষাত্ করার। আমার তাও নেই। আমার এখন নিজেকে আপন দেশেই পরবাসী বলে মনে হয়।”
জেসি কিংবা পেপোসি এখানে দু’জন উদাহরণ মাত্র। তাদের মতো স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নারীর সংখ্যা গুণে বের করা কঠিন। ভিনদেশি পুরুষকে ভালোবাসা এবং তাকে বিয়ের পরিণতি যে এতটা করুণ হবে তা হয়তো তারা বুঝতে পারেননি আগে। আর বুঝতে পারলেও বিচ্ছিন্ন হবার ভয় ভালোবাসাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারতো কিনা কে জানে! ব্রিটিশ সরকারের কঠোরতায় বিলাপই তাদের একমাত্র সঙ্গী হয়েছে।
ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন এই কঠোর আইনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। ব্যাপক আন্দোলন ও সমালোচনার মুখে এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘ব্রিটেনে আমরা তাদেরকে স্বাগত জানাই যারা তাদের পরিবারসহ এখানে কঠোর পরিশ্রম করে দেশটির জন্য অবদান রাখতে পারবে। কিন্তু কারও পরিবারের খরচ এদেশের করদাতাদের অর্থে চলতে পারে না। ব্রিটিশ জীবনের সঙ্গে একীভূত হতে হলে অভিবাসী ও তার পরিবারকে এদেশের সাথে খাপ খাওয়াতে হবে অর্থাত্ তাদের ব্রিটিশ ভাষা জানতে হবে এবং নিজেদের খরচ নিজেদেরই মেটাতে হবে।’ সরকারের এই বিবৃতি পড়ার পর জেসিদের জন্য কোনো আশা থাকছে কি না সেটা তারাই ভালো বুঝতে পারবেন।
