বেড়ানো : প্রাচীন বনের খোঁজে

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৪, ২০:১৮
দেশের প্রাচীনতম বন কোনটি? ঢাকার খুব কাছে দেশের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বন সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাট উপজেলায় অবস্থিত রেমা কালেঙ্গা। বেশ কয়েক মাস আগে এ তথ্য জানার পর থেকেই উদগ্রীব হয়ে ছিলাম রেমা কালেঙ্গা যাওয়ার জন্য। ভ্রমণপিপাসু মন, নতুন জায়গার সন্ধান পেয়ে, ভ্রমণে না গেলে কি আর সেই জ্বালা প্রাণে সয়! চট জলদি তিন সারু ভাই আর এক মামা শ্বশুরকে প্রস্তাব দিলাম রেমা যাওয়ার, তারাও প্রস্তাব লুফে নিলেন। দিনক্ষণ ঠিক, যাব ভোর পাঁচটায়। ঘুম থেকে ঠিক চারটায় উঠে জানালা দিয়ে দেখি টিপ টিপ বৃষ্টি, মনটাই খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু থেমে থাকলাম না, কারণ একবার যদি কোথাও যাওয়ার নাম নিই, তাহলে না যাওয়া পর্যন্ত মাথার পোকা নামে না অর্থাত্ ধ্যানে জ্ঞানে শুধু ওই স্থানটিতেই মন পড়ে থাকে। ঘুম কাতুরে ড্রাইভারকে গাড়ি রেডি করতে বললাম। ফজরের নামাজ আদায় করে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে বের হয়ে পড়লাম প্রকৃতির টানে। ভ্রমণ সঙ্গী রিপন, জিল্লুর রহমান, মামা সিদ্দিকুর রহমান আকাশ। ইতোমধ্যে আমাদের প্রতি বৃষ্টির মায়া জেগেছে, তাই হয়তো সূয্যি মামা কিরণ ছড়াচ্ছে। রৌদ্র পেয়ে মনও বেশ উত্ফুল্ল। এতটাই উত্ফুল্ল যে, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে সকালের নাস্তার বিল রিপন ভাইকে দিতে বললাম, জানি না সে কী ভেবেছে। কারণ একটাই তার সাথে আমার প্রথম ট্যুর। নাস্তা পর্ব শেষ। গাড়ি পুনরায় কালেঙ্গার পথে ছুটছে। পূর্ব থেকেই গাইডের সেল নম্বর ছিল, তাই পথ চিনতে কষ্ট হচ্ছিল না। গাইড আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ইতোমধ্যে চুনারু ঘাট এসে হাজির, আবারও দিক নির্দেশনা চেয়ে এবার সেই কাঙ্ক্ষিত রেমা কালেঙ্গার সরু পথে গাড়ি ছুটছে। পথের দু’পাশের দৃশ্যই বলে দেয় আমরা এগোচ্ছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার কোনো এক নিসর্গের পানে। গাড়ি থামল বর্জুস নামক স্থানে, এবার কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পথে হাঁটা, প্রায় পনের মিনিট হাঁটার পর ভাড়া করা বাইকে চড়ে সবুজ বনানীকে সঙ্গী করে রেমা কালেঙ্গার মূল ফটকে এসে হাজির। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিমের সাথে সাক্ষাত্ হলো, বিনয়ী করিম সাহেব প্রাচীনতম বন রেমা কালেঙ্গার বিভিন্ন তথ্য আমাদেরকে জানালেন। এবার গভীর অরণ্যের পথে পা বাড়ালাম। বনের ভিতর বন্যপ্রাণী ও অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার ট্রেইল পথ রয়েছে। আমরা এক ঘণ্টার ট্রেইল পথেই প্রবেশ করলাম। বন ভ্রমণের পূর্ব পরিকল্পনা না থাকায় সাধারণ পোশাকেই অভিযান, তাই একটু বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন। কিছুদূর যাওয়ার পর ওয়াচ টাওয়ার পেলাম। আরামপ্রিয় রিপন ভাই যেন হাঁপিয়ে উঠল, তারপরও চোখে তার জয়ের নেশা। রেমা কালেঙ্গা বন বিভাগের অন্তর্গত। তাদের সহযোগিতায় আইপ্যাক। সরকার ১৯৯৪ সনে এই বনের ১৭৯৫ হেক্টর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছেন। বনের মোট আয়তন তের হাজার দুই শত সতের দশমিক একুশ একর। এই বনে চাপলিশ, গর্জন, গামারি, জারুল, জাম, আকাশি ও সেগুন বৃক্ষ রয়েছে। একেকটি গাছের পরিধি ব্যাপক, যা স্বচক্ষে না দেখলে লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। বন্য প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে চিতাবাঘ, মেছোবাঘ, বার্কিং ডিয়ার, কুলু বানর, চশমা হনুমান, লজ্জাবতি বানর, মুখপোড়া হনুমান, কালো কাঠবিড়ালী এবং ময়না বিলে বিপন্ন প্রজাতির উড়ন্ত কাঠবিড়ালীর দেখাও মেলে। গাইড জানালেন এই বনে দুইশত পাঁচ প্রজাতির পাখি রয়েছে। ভ্রমন বিলাসী বন্ধুরা আর দেরি কেন? হাতে দুই দিনের সময় নিয়ে বের হয়ে যান প্রাচীনতম বন রেমা কালেঙ্গার পথে। খরচ নাগালের মধ্যে, জনপ্রতি ঢাকা হতে দুই হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট। বন ভ্রমণের সহযোগিতার হাত বাড়াবে দক্ষ গাইড আব্দুর রহমান। যোগাযোগ :ঢাকা-সিলেট রুটে যেকোনো পরিবহনে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি অথবা লোকাল বাসে চুনারুঘাট বাজার। অতঃপর রিজার্ভ সিএনজি কিংবা ভাড়ায় খাটা মোটর সাইকেল। বনে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ২০ টাকা, কটেজ ভাড়া সাতশত ও এক হাজার টাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা বিল পরিশোধে কটেজ কর্তৃপক্ষের। ভ্রমনকালীন টাকার ক্ষেত্রে দরদাম করে নেওয়াই ভালো।