পুরান ঢাকার বাকরখানি নতুন ঢাকার মানুষের কাছেও সমান প্রিয়। এর কদর এত বেশি যে, কখনো কখনো কোন কিছুর তুলনায়ও বাকরখানির নাম চলে আসে। ‘পুরান ঢাকার বাকরখানির মতই আকর্ষণীয়’ এমন বাক্য প্রায়শ শোনা যায়। বাকরখানির এত প্রশংসা কিংবা চাহিদার কারণে এটি তৈরির পেছনে থাকা লোকগুলোর জীবন কেটে যায় স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা খুশি হতেন যদি এই গরমেও বাকরখানি বেশি করে বিক্রি হতো।
বাকরখানির বিক্রি কমে যায় রোজা ও গরমে। এ সময় ব্যবসা জমে না। আয় কমে যায়- বললেন আবু তাহের। বছরের অন্যান্য সময়জুড়ে যে ব্যবসা হয় তাতে দিন চলে যায়। শুধু বাকরখানি বিক্রি করেই যাপিত জীবনের বহু বছর কেটে গেছে। কেউ বা বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে পড়েছেন এই ব্যবসায়। আবু তাহেরও তেমনি একজন। যার রাজনীতি নিয়ে মাথাব্যথা নেই। সরকারের কাছেও দাবি দাওয়া নেই। নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ার জন্য যথেষ্ট। স্বউদ্যোগী তাহেরের জীবন সংগ্রামও দীর্ঘদিনের।
তার মতই বহুলোক আছেন যারা স্বকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের জীবিকা মেটাতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিকে টেনে তুলতে সহায়তা করছেন। এদেরকে নিয়ে সরকারকেও ভাবতে হয় না। স্বল্প চাহিদার এই লোকগুলো অল্পতেই সন্তুষ্ট। কষ্টের জীবনেও দু’পয়সা লাভ পেলে প্রশান্তির ছায়া নেমে আসে চোখে মুখে। আবু তাহের বললেন, ‘ঘাম ঝরিয়ে টাকা রুজি করি। ব্যবসা ভাল হলে শান্তি লাগে’।
পুরান ঢাকা আর বাকরখানির নাম এক সূত্রে গাঁথা। এখন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেও বাকরখানির বিক্রি জমজমাট। বড় বিপণী বিতান কিংবা সুপার স্টোরগুলোতেও বাকরখানি পাওয়া যাবে। হবিগঞ্জের আবু তাহেরের দাবি রাজধানীসহ দেশব্যাপী ব্যবসাটি টিকিয়ে রেখেছেন কেবল তাদের এলাকার (হবিগঞ্জের লাখাই থানা) অধিবাসীরাই। পঞ্চাশোর্ধ্ব আবু তাহের ঢাকায় আসেন দেশ স্বাধীনের পরপরই। এসেই বাকরখানির দোকানে কাজে লেগে যান। বংশ পরম্পরায় তিনি এই কাজে জড়িয়ে পড়েন। বললেন, তার দাদাও বাকরখানি বানাতেন। এই কাজ শিখতেই তার ৫ বছর লেগেছে। দীর্ঘ প্রায় চার দশক কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু হলেও ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শেষ করেছেন। তারপর নিজেই শুরু করেন ব্যবসা। গ্রামে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ১৪ শতক জমি বিক্রির টাকা ছিল পুুঁজি। বাকরখানির মূল উপাদান তেল আর ময়দা। আবু তাহের জানান, প্রতি কেজি বাকরখানি ১০০ থেকে ১১০ টাকা করে বিক্রি করেন। আর প্রতি পিস ৩ টাকা করে। প্রতিদিন তার দোকানে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার বাকরখানি বিক্রি হয়। ব্যবসা শুরুর পর বর্তমানে দোকান ভাড়া, ২ জন কর্মচারীর ১০ হাজার টাকা বেতন দিয়ে যা থাকে তাতেই সন্তুষ্ট তিনি। স্ত্রী আর ৪ সন্তান নিয়ে কোনরকমে চলে যাচ্ছে তাদের দৈনন্দিন জীবন। তবে রমজান মাস আর গ্রীষ্মকালে বাকরখানি বিক্রি তুলনামূলক কমে যায়। এই সময়টায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
