এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাওয়ায় লবণাক্ততা গ্রাস করছে এবার সুপেয় পানিকেও। লবণাক্ততার কারণে কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি এখন গভীর নলকূপের সুপেয় পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ অসহনীয় হয়ে উঠছে। গভীর নলকূপের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন এখানকার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
প্রকৌশলীদের মতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পানিতে লবণাক্ততার সহনীয় মাত্রা ২শ’ পার্সপার মিলিয়ন (পিপিএম)। বাংলাদেশের জন্য লবণাক্ততার সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৬শ’ পিপিএম। পিপিএম হচ্ছে ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিজস্ব সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী ৬শ’ পিপিএম নির্ধারণ করা হলে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ মাত্রা ছাড়িয়ে বেশি লবণাক্ত পানি উঠছে নলকূপগুলো থেকে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলায় ২/৩ বছর পূর্ব থেকেই নলকূপের পানিতে ৭শ’ পিপিএম মাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অপর জেলাগুলোর অবস্থাও প্রায় একইরকম। প্রকৌশলীরা জানান, আগে এ অঞ্চলের শহর এলাকায় ৯শ’ থেকে এক হাজার ফুট ও গ্রামগঞ্জে ৭শ’ থেকে ৮শ’ ফুট গভীরে নলকূপ বসানো হলেই সুপেয় পানি পাওয়া যেতো। এখন শহরে এক হাজার থেকে ১২শ’ ফুট ও গ্রামে ৮শ’ থেকে ১ হাজার ফুট গভীরে নলকূপ বসাতে হচ্ছে। তা না হলে সুপেয় পানি মিলছে না।
বরিশাল ও বরগুনা জেলার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শাহ আলম জানান, বানারীপাড়া উপজেলার চাখার ইউনিয়নের মেম্বর রফিকুল ইসলামের ও বাইশারী গ্রামের হাকিম বেপারীর বাড়ির নলকূপে প্রায় ৫শ’ পিপিএম মাত্রায় লবণাক্ত পানি উঠছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মো: শাহ আলম ইত্তেফাককে জানান, সবচেয়ে পাথরঘাটা ও মঠবাড়িয়ার পানিতে পিপিএম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে পিপিএম-এর পরিমাণ এক হাজার হলেও সে পানি পান করার অনুমতি দিচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। পাথরঘাটায় ৪ হাজার পিপিএম মাত্রার পর্যন্ত লবণাক্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে বলে প্রকৌশলীরা মনে করছেন।
ভোলার নির্বাহী প্রকৌশলী আঃ মজিদ জানান, সেখানকার সদর উপজেলা ছাড়াও দৌলতখান ও বিচ্ছিন্ন উপ-দ্বীপ মনপুরায় ৬শ’ পিপিএম অতিক্রম করে নলকূপগুলো থেকে লবণাক্ত পানি উঠছে ।
ঝালকাঠীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবদুস ছালাম জানান, কাঠালিয়া উপজেলার পাটিখালঘাটা ও চেচিরামপুর নামক স্থানে ৬শ’র বেশী পিপিএম লবণাক্ত পানি পাওয়া গেছে।
পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী সহিদুল ইসলাম একই পরিমাণ লবণাক্ততার পরিমাণের কথা জানিয়ে বলেন, বরিশাল ও ঝালকাঠী জেলার সাথে পটুয়াখালীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণের মিল রয়েছে। পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম আবদুল্লাহ মিয়া জানান, জেলার স্বরূপকাঠী, কাউখালী, নাজিরপুর, ভান্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া ও জিয়ানগর এলাকার কয়েকটি টিউবওয়েলে ৬শ’র বেশী পিপিএম লবণাক্ত পানি উঠছে আরো ২-৩ বছর থেকেই।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ উপকূল জুড়ে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধিসহ বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। একইসাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপরিভাগের মিঠাপানিতেও লবণাক্ততা বেড়েছে। একটি গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকৌশলীরা জানান, মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে বিভাগের ৬ জেলার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দেড় থেকে দু’ ফুট নিচে নেমেছে। ফারাক্কা বাঁধসহ ভারত থেকে বাংলাদেশের নদ-নদীর পানির উত্স্যমুখে প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে নদীগুলো সিংহভাগই ভরাট হয়ে গেছে। এসব নদীতে স্রোত না থাকায় পানি সমুদ্রে প্রবাহিত হওয়ার পরিবর্তে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উল্টো নদ-নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে কৃষিজমিতেও লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে।
মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) পরিচালিত জরিপে দেখা যায় ১৯৭৩ সালে দেশের ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর আবাদী জমিতে লবণাক্ততা রয়েছে। ২০০০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর আবাদী জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১০ সালে ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার তথ্য প্রকাশ করা হয়। দু’ বছর পর এসআরডিআই আরো একটি জরিপ করে জানিয়েছে অস্বাভাবিক হারে উপকূলের আবাদী জমি লবণপানি গ্রাস করে নিচ্ছে। উপকূলভাগের কৃষিজমির ৩০ ভাগই লবণপানি গ্রাস করেছে বলে এসআরডিআই’র কর্মকর্তারা জানান। তারা বরিশাল বিভাগের বাইরে খুলনা বিভাগের নড়াইল, সাতক্ষীরাসহ বিশাল একটি অঞ্চলে লবণপানি ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
লবণাক্ততার কারণে এবার খুলনায় কৃষি চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে জানানো হয়। কৃষিকাজে বিপর্যয় দেখা দেয়ার পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাবার পানিতে অতিরিক্ত লবণ নিয়ে নতুন শংকায় পড়েছেন জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। তারা জানান, লবণাক্ততার পরিমাণ সুপেয় পানিতে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বর্তমানে নলকূপ বসানোর পূর্বে স্থান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেয়া হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত লবণপানির আশংকা দেখা দিলে নলকূপ বসানোর জন্য স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে তাদের। জনস্বাস্থ্য দপ্তরের প্রকৌশলীরা নলকূপের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়াকে চিহ্নিত করে বলেন, পুকুর-নদী ও বৃষ্টির পানিসহ উপরিভাগের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। তা না হলে আরো বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
