কচি-কাঁচার আসর :পুরনো সেই দিনের কথা

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ১৮:২১
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনার ইতিহাসে ২ এপ্রিল একটি উজ্জ্বল দিন। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের এদিন ইত্তেফাকের ভেতরের পৃষ্ঠায় প্রথম ছাপা হয় কচি-কাঁচার আসর। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পরামর্শ ও নির্দেশে কচি-কাঁচার আসর সম্পাদনায় নিযুক্ত হন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। আমৃত্যু তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেকে কচি-কাঁচার আসর ও কচি-কাঁচার মেলা মিলিয়ে দেখেন। আসলে তা সঠিক নয়। কচি-কাঁচার আসর হল ইত্তেফাকের পাতায় প্রকাশিত শিশু-কিশোরদের জন্য একটি পাতা। আর কচি-কাঁচার মেলা হল একটি শিশু-কিশোর সংগঠন। এটিও কচি-কাঁচার আসরকে ঘিরে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আগ্রহে ও পরামর্শে দাদাভাই গড়ে তোলেন। এটি একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান। আর কচি ও কাঁচা হল দাদাভাই সম্পাদিত একটি মাসিক শিশু-কিশোর পত্রিকা। এটি ১৯৭১ সালের পর আর প্রকাশিত হয়নি। কচি-কাঁচার আসরের বয়স অনেক বছর হল। ১৯৫৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিসেব করলে ৫৯ বছর অর্থাত্ অর্ধ শতাব্দীরও বেশি। এই ৫৯ বছর কচি-কাঁচার আসর নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। শুধু ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন থেকে ১৯৬৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক বন্ধ থাকার কারণে কচি-কাঁচার আসর প্রকাশিত হয়নি। ঐ সময়টাতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইউব খানের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খান সাধারণ মানুষের প্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাক বন্ধ করে দেন। দাদাভাইয়ের সম্পাদনায় কচি-কাঁচার আসর ছিল বেশ জমজমাট। দ্বিতীয় আসর থেকে তিনি পাতায় চালু করেন বিভিন্ন বিভাগ। পাতায় সদস্য ফরম ছেপে বেশ মজার কাণ্ডটি করেন তিনি। কে হবে আসরের প্রথম সদস্য? অবশেষে লটারির মাধ্যমে প্রথম সদস্য নির্বাচিত হন সৈয়দ মহিউদ্দিন মনসুর। একটি বাক্সে ৪০০ ফরম ফেলে ইত্তেফাকের তখনকার ছাপাখানা প্যারামাউন্ট প্রেসের মালিকের ছোট্ট ছেলে খোকন নামটি তুলে আনে মনসুরের। আমিও পরবর্তীকালে আসরের সদস্য ছিলাম। আমার সদস্য নম্বর ছিল—৩৬৩৫৯। কচি-কাঁচার আসরের শুরুতে পাতার বিভাগগুলো ছিল এমন শিরোনামের। যেমন— এখনো কিছু স্মরণে আছে, ডাকপিওনের ঝুলি, কচি-হাতে মুক্তো ঝরে, কুড়িয়ে পেলাম মানিক রতন, জানতে হবে, শুনতে শুনতে সোনারগাঁও/কাহিনী তার বলে যাও। তখন কচি-কাঁচার আসর ছাপা হতো দু’পৃষ্ঠা জুড়ে। কচি-কাঁচার আসর মূলত ছিল ছোটদের লেখালেখির স্কুল। শিশু-কিশোর ভাই-বোনেরা এ পাতাটিতে লেখালেখির অনুশীলন করতো বা এখনো করছে। দাদাভাই মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত আসরের লেখা নিজেই নির্বাচন করতেন। তবে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে এ কাজে বিভিন্নজন সহযোগিতা করেছেন। এরা হলেন—সৈয়দ শাহজাহান, মাহবুব তালুকদার, শিল্পী হাশেম খান, শামসুজ্জামান খান, শাহাদাত চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, সুব্রত বড়ুয়া, ফজল-এ-খোদা, ড. আলী আসগর, আবু কায়সার, মোহাম্মদ মোস্তফা, নাজমুল হাসান, মাহাবুবুল আলম, খালেক বিন জয়েনউদদীন, ওয়াসিফ-এ-খোদা, শেখ আবদুল হাকিম, সারওয়ার উল ইসলাম, মিহির কান্তি রাউত, রেবা আফরোজ। আজ থেকে ঊনষাট বছর পূর্বে দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর, দৈনিক পাকিস্তানের সাতভাই চম্পা, দৈনিক সংবাদের খেলাঘর ও দৈনিক আজাদের মুকুলের মাহফিল ছিল লেখালেখিতে হাতেখড়ি নেবার একমাত্র জায়গা। এই চারটি পত্রিকার শিশুদের বিভাগগুলো লেখা প্রকাশের ব্যাপারে ছিল ভিন্ন মেজাজী। সাতভাই চম্পা সম্পাদনা করতেন আফলাতুন। মোহাম্মদ মোদাব্বের পরিচালনা করতেন মুকুলের মাহফিল, হাবীবুর রহমান খেলাঘর আর দাদাভাই কচি-কাঁচার আসর। কচি-কাঁচার আসর ও খেলাঘরে ছাপা হতো আধুনিক ঢঙের লেখা এবং এতে লিখতেন ছোট-বড়ো সবাই। খেলাঘর তখন ছিল বেশি বাস্তববাদী এবং সমাজসচেতন। সাতভাই চম্পা ছিল সর্বাধুনিক। দাদাভাই লেখা নির্বাচনে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিষয়টির প্রতি বেশি দৃষ্টি দিতেন। শিশুদের চরিত্র গঠন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, অধিকার ও বিকাশের প্রতি তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল অত্যন্ত সজাগ। প্রেসে দেবার আগে একটি লেখা তিনি বার বার পড়তেন। আমাদের অনেকের লেখা তিনি সংশোধন করে ছেপেছেন। মনঃপুত না হওয়া অবধি লেখা কখনোই মনোনীত করতেন না। লেখা ছাপার ব্যাপারে তিনি কারো অনুরোধ শুনতেন না। এ কারণেই কচি-কাঁচার আসর সে সময়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল। বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃত, অর্থনীতি ও রাজনীতির অঙ্গনে আজ যারা সুবিখ্যাত, তারা অনেকেই এই কচি-কাঁচার আসরকে আশ্রয় করেই লেখালেখি শুরু করেছিলেন। তবে তাদের সংখ্যা বেশি নয়। দাদাভাই তাঁর নির্বাচিত লেখকদের লেখাই পাতায় স্থান দিতেন। তবে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে তার মত ছিল উদার। ভালো প্রতিভারই ক্ষুদে লেখকদের লেখা তিনি নিয়মিত ছেপেছেন। ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, সুফিয়া কামাল, আনিসুজ্জামান, শামসুজ্জামান খান, আতোয়ার রহমান, রাহাত খান, আব্দুল্লাহ আল মুতী, ফয়েজ আহমদ, শামসুর রাহমান, ড. রফিকুল ইসলাম, সুব্রত বড়ুয়া, রশীদ হায়দার, জাহানারা আরজু, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন, আলী ইমাম, মাহমুদউল্লাহ, আখতার হুসেন, ফারুক নওয়াজ, লুত্ফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, রোকেয়া খাতুন রুবী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, প্রাণেশ কুমার মন্ডল, আল মুজাহিদী, আসমা আব্বাসী, ওমর আলী, দিলওয়ার, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, সুকুমার বড়ুয়া, বেলাল চৌধুরী, এখলাসউদ্দিন আহমদ, মহাদেব সাহা, রাবেয়া খাতুন, হালিমা খাতুন, হায়াত্ মামুদ, হেলেনা খান, সানাউল হক খান, আসাদ চৌধুরী, আবু হাসান শাহরিয়ার, আহমাদউল্লাহ, দীপংকর চক্রবর্তী, তপংকর চক্রবর্তী, কেজি মোস্তফা, শাহাবুদ্দীন নাগরী, জাকিয়া সুলতানা, সুজন বড়ুয়া, আনজীর লিটন, জ্যোতির্ময় মল্লিক, আবুল হোসেন আজাদ, তুষার কর, ফারুক মাহমুদ, সৈয়দ আল ফারুক, মেহের আফরোজ পান্না, আবু সাঈদ জুবেরী, ওয়াহিদুজ্জামান, হাসানুর রহমান, আলম তালুকদার, আসলাম সানী, ফাহমিদা নিলুফার ছন্দা, আবুল মোমেন, সৈয়দা নেশাত আরা খানম, জাকির হোসেন বুলবুল, মঈনুদ্দীন খালেদ, শামসুল হক দিশারী, খালেদ হোসাইন, আলমগীর বাবুল প্রমুখের লেখা দাদাভাই কচি-কাঁচার আসরে নিয়মিত ছাপাতেন। মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি ইন্টারনেট চালু হওয়ায় ফ্যাক্স, ই-মেইল, ই-বুক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক চালু হওয়ায় বই-পুস্তক তথা পত্র-পত্রিকার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। হালে অন-লাইন নিউজ পেপার চালু হলেও প্রিন্টিং নিউজ পেপারের পাঠকসংখ্যা গোটা দুনিয়াতেই বেশি। এক্ষেত্রে শিশুদের পাতারও পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্ধ শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত শিশুতোষ পাতা কচি-কাঁচার আসর কিংবা দৈনিক সংবাদের খেলার আসরই তার প্রমাণ। কচি-কাঁচার আসর এখন প্রতি সপ্তাহে বুধবার প্রকাশিত হয়। চার রঙে এবং দু’পৃষ্ঠার আসর এখন বেশ আকর্ষণীয়। প্রতি সপ্তাহে শতশত ক্ষুদে লিখিয়ে ভাইবোন ও সদস্যরা আসরে চিঠি পাঠায়। হালে আসরে নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। বিভাগগুলো হলো: নতুন যারা সদস্য হলে, তোমাদের চিঠি থেকে, তোমাদের জন্য লেখা, আমার কথা, আঁকা ছবি, তোমাদের চিঠি পেলাম, স্মরণীয়-বরণীয়, আমার প্রিয় স্কুল, আমার প্রিয়বই ও কমিকস। বিগত বছরগুলোয় আসরের পাতায় অনেকে লিখেছেন, এদের মধ্যে মাকিদ হায়দার, রেজাউদ্দিন স্টালিন, ঝর্ণা দাস পুরকায়স্থ, কাজী কেয়া, স.ম. শামসুল আলম, জাহাঙ্গীর আলম জাহান, মিলন সব্যসাচী, মোশাররফ হোসেন ভূঞা, নাজমুল হক নজীর, মুস্তাফা মাসুদ, মফিজুল ইসলাম, তাহমিনা কোরাইশী, আনওয়ারুল কবীর বুলু, গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল, আমীরুল হক, জাহানারা রশীদ ঝরনা, জাকির হোসেন চৌধুরী, গুলশান-ই-ইয়াসমীন, মোহাম্মদ ইলইয়াছ, আসলাম প্রধান, আবুদুর রকিব, বিশ্বনাথ বিশ্বাস, সুলতান আকন, শাহজাহান মোহাম্মদ, রানা জামান, আবেদীন জনী, রওশন মতিন, সামিউল হক মোল্লা, গোলাম নবী পান্না, সাফিনা আক্তার, শাফিকুর রাহী, জাহাঙ্গীর আলম, সালাম হাসেমী, সুমনা আক্তার মীম, কাজী রিচি ইসলাম, বাতেন বাহার, ইমরুল ইউসুফ, শওকত আরা বেগম, ইকবাল বাবুল, আইরিন নিয়াজী মান্না, মিতুল সাইফ, মালেক মাহমুদ, মো. মনির তালুকদার, মির্জা আদিপ, ফয়সাল শাহ, ইয়াসিন চাতক, সাবিত সারওয়ার, খান চমন-ই-এলাহি, মীর রবিউল ইসলাম রবি, খগেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, শামসুদ্দিন আহমেদ, আরিফ নজরুল, মনি হায়দার, ফজলে আহমদ, মাহবুব রেজা, সাইফুল ইসলাম জুয়েল, খন্দকার মাহমুদুল হাসান, আসাদুল্লাহ মামুন, জাহাঙ্গীর হাবীবউল্লাহ, মোজাম্মেল হক নিয়োগী, এ.কে.এম শাহীদুর রহমান, সাহিদা বেগম, কামাল সিদ্দিকী, মিয়াজান কবীর, জাহানারা জানি, চঞ্চল শাহরিয়ার, মানজুর মুহাম্মদ, ইউসুফ-আল আজাদ, নজরুল ইসলাম শান্ত, সাজু রহমান, মহসিন আহমেদ, মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব, ফেরদৌস চৌধুরী, দীপিতা রহমান, হিলারী হিটলার আভী, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, সাজ্জাদ হুসাইন, রনি অধিকারী, মোহাম্মদ মারুফুল, দিলারা মেসবাহ, অমল সাহা, আখতারুল ইসলাম, সিরাজুল ফরিদ, অদিত্য রুপু, পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, আইউব সৈয়দ, তুষার কর, কাদের বাবু, তুষার আহমেদ পাপ্পু, বেনী মাধব সরকার, অজাজী খান স্বাতী, মিজানুর রহমান মিথুন, নাসিরউদ্দিন তুসী, শাজাহান আবদালী, সোহেল মল্লিক, আল নাহিয়ান প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। মুদ্রণ প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের হাল-আমলে পুরনো আসরগুলো এখনো মনে হয় অতি সজীব এবং মেকআপ, গেটআপগুলো আরো আধুনিক। লেখা নির্বাচনেও তখনকার শিশুতোষ পাতার সম্পাদকরা ছিলেন আন্তরিক ও আধুনিক। শিশু-কিশোরদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তারা দায়িত্ব পালন করতেন। কচি-কাঁচার আসরে সেকালে যারা লিখেছেন এবং বুড়ো হয়ে গেছেন, তারা এ সম্পর্কে আরো ভালো বলতে পারবেন। একটি আসরের বয়স অর্ধ শতাব্দীরও বেশি— এটি চাট্টিখানি কথা নয়। কচি-কাঁচার আসর যুগ-যুগ ধরে শিশু-কিশোরদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করুক। খালেক বিন জয়েনউদদীন