ইতিহাস বদলের সংস্কৃতি

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৫
জোশেফ গোয়েবলসের কথা মনে আছে? হিটলারের ‘প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার’ ছিলেন তিনি। তাঁর কাজ ছিল হিটলারের পক্ষে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। মিথ্যাকে সত্য বানানো। তাঁর থিউরি ছিল— মিথ্যা+মিথ্যা+ মিথ্যা...=সত্য। গোয়েবলস বলতেন, একটি মিথ্যাকে দশবার বললে তা সত্যের মতো শোনায়। ওই থিউরিতে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী, কবি, সাংবাদিকরা টাকার বিনিময়ে হিটলারের প্রচার চালাতেন। রেডিও তখন দুর্লভ বিষয়। গোয়েবলস ভাবলেন, একই রেকর্ড বার বার বাজালে মানুষ অবশ্যই বিশ্বাস করবে। তাই রাস্তার মোড়ে মোড়ে তিনি উচ্চ শব্দের রেডিও বসালেন। সেখানে রাত-দিন হিটলারের পক্ষে প্রোপাগান্ডা বাজতো। তার পরও প্রচার যেন জমছিল না। গোয়েবলস তখন সস্তায় নতুন রেডিও বানিয়ে বিলি করলেন। নাম দিলেন ‘পিপলস রেডিও’। সেখানে একটাই চ্যানেল। তাতে সারাক্ষণ নাত্সী ও হিটলারের গুণগান। পত্র-পত্রিকা, সাহিত্য, কবিতা অর্থাত্ সমস্ত প্রচারযন্ত্রে একই রকম প্রোপাগান্ডা চললো। ওইসব প্রোপাগান্ডায় হিটলার জার্মানিতে রীতিমত মহামানবে পরিণত হলেন। গোয়েবলস বলতেন—মিথ্যা যখন বলবে, তখন বড় মিথ্যাই বলবে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা তারেক রহমানের আচমকা ‘জিয়াউর রহমান প্রথম রাষ্ট্রপতি’ দাবি আর তাঁর পক্ষে দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতৃত্ববৃন্দের লাগাতার প্রোপাগান্ডা যেন গোয়েবলসের সেই বিখ্যাত থিউরির অভিন্ন অনুকরণ। হাস্যকর হলো, খোদ বিএনপির ওয়েবসাইটেই জিয়াউর রহমান ৭ম রাষ্ট্রপতি। এই তথ্য তাদের প্রোপাগান্ডায় বাধা হওয়ায় শনিবার সন্ধ্যে থেকে ‘কারিগরি ত্রুটির’ অজুহাতে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছে। মহলবিশেষের এরূপ গোয়েবলসীয় কার্যক্রম অবশ্যই নতুন নয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বানাতে বিএনপি নেতৃবৃন্দ মরিয়া। তিনি জীবদ্দশায় নিজে কখনো এরূপ দাবি করেননি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় তিনি ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই লেখায় উলটো তিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সবুজ সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমান বিএনপি নেতৃবৃন্দ কখনো স্বীকার না করলেও ওই প্রবন্ধে খোদ জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক’ হিসেবে স্বীকার করেন। এটা কোনো অর্থেই বোধগম্য নয়, ঠিক কী উদ্দেশ্যে বিএনপি এতদিন পর হঠাত্ জিয়াউর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি বানাতে উঠেপড়ে লাগলো। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের আমল গেলো। বিএনপির ১০ বছরের শাসনকাল গেলো। এ নিয়ে কখনো তর্ক হয়নি। তর্ক হওয়ার কারণও নেই। কারণ প্রচুর দলিল-দস্তাবেজ-গবেষণাগ্রন্থ আছে। সংবিধান আছে। ইতিহাসের অনেক সাক্ষীও এখনো জীবিত। এটা সম্পূর্ণ মীমাংসিত একটা বিষয়। ঐতিহাসিক সত্য। এ নিয়ে এখন বিএনপি কেন অহেতুক ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে তা স্পষ্ট নয়। এর ভয়াবহ পরিণাম নিয়েও তারা ভাবিত নয়। এমনিতে ক্ষমতার হাত বদলের সঙ্গে ইতিহাস বদলের সংস্কৃতি, এ দেশের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে যদি ‘প্রথম রাষ্ট্রপতি বিতর্ক’ যোগ হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম ও পরবর্তী প্রজন্ম কী শিখবে, কী জানবে? তাদের কোমল মনে তথ্যবিভ্রান্তির জাল তৈরির দায় নেবে কে? দুই শীর্ষ দলের দুই প্রাণপুরুষ নিয়ে বিরুদ্ধ দলের লাগাতার চরিত্রহনন এবং তাঁদের অহেতুক খাটো ও হেয় করার রাজনীতি আর কত কাল? জিয়াউর রহমান শুধু সেক্টর কমান্ডারই ছিলেন না, তিনি একজন ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। কেন তাঁকে ‘নামমাত্র মুক্তিযোদ্ধা’ বলা হবে? যাঁর যে সম্মান প্রাপ্য, তাঁকে তা দিলে ক্ষতিটা কোথায়? অন্যকে অসম্মান করে কি সম্মানিত হওয়া যায়? ভাবতে অবাক লাগে—এ আমরা কী করছি? হাজার সমস্যায় দেশ ভারাক্রান্ত। এ নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি, কৃষি সর্বক্ষেত্রে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে। আর আমরা পড়ে আছি, স্বাধীনতার ঘোষক কে, কে প্রথম রাষ্ট্রপতি—বঙ্গবন্ধু না জিয়াউর রহমান; এইসব অনতিপ্রেত বিতর্কে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও আমাদের অবিশ্বাস্য মানসিক পশ্চাত্পদতা দেখে বার বার মনে পড়ছে নজরুলের সেই কালজয়ী পঙিক্ত: ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো পিছে বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজছি হাদিস কোরান চষে।’ ঢাকা