যান্ত্রিক সভ্যতা পারিবারিক বন্ধনকে ক্রমান্বয়ে শিথিল করে ফেলছে। পরিত্যক্ত হচ্ছে যৌথ পরিবারের ধ্যান-ধারণা। বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা মনে করে—এমন অকৃতজ্ঞ সন্তান-সন্ততি আমাদের দেশে এখন খুব একটা কম নয়। ফলে শেষ জীবনে অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে অথবা মৃত্যু হয় সন্তানের হাতে!
সন্তানদের উপেক্ষার শিকার হয়ে বৃদ্ধ বয়সে ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা কঠোর কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহকে নিয়তির লিখন বলে মেনে নিতে বাধ্য হন অনেকে। কুমিল্লার এক বৃদ্ধ জননীকে তাঁর দুই সন্তান বরিশালে ফেলে রেখে পালিয়েছে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করে। ৩০ জানুয়ারি মাঘের হাড় কাঁপানো শীতে আরাফাতুন নেছা নামের ৮৫ বছরের এ বৃদ্ধাকে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকি বাসস্ট্যান্ডে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। তাঁর দুই পুত্র কুমিল্লা থেকে বাসে করে নিয়ে এসে টরকি বাসস্ট্যান্ডে তাঁকে ফেলে সম্ভবত পালিয়ে যায়। তীব্র শীত ও ক্ষুধায় আক্রান্ত বৃদ্ধাকে দেখে এলাকাবাসীর কেউ কেউ তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি তাতে রাজি হননি। আরাফাতুন নেছা নামের ওই বৃদ্ধা সন্তানদের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার পরও বিশ্বাসের ঘোর কাটাতে পারেননি। বৃদ্ধার বিশ্বাস—তাঁর সন্তানরা ফিরে আসবে এবং তাঁকে নিয়ে যাবে। এভাবে রাস্তার পাশে এক সপ্তাহের বেশি অবস্থান করায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে স্বাস্থ্য ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে। জননীকে ফেলে দুই কুলাঙ্গার পুত্রের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়েরই চিত্র। প্রতিটি সন্তানের জন্মের সঙ্গে তার মায়ের অসামান্য আত্মত্যাগ জড়িত। প্রায় ১০ মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন তিনি। জন্মের পর সন্তানকে আগলে রাখেন বুকে। নিজে কষ্ট করেও সন্তানকে প্রতিপালন করেন অসামান্য নিষ্ঠায়। সেই মায়ের ভরণ-পোষণ অস্বীকার শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, বর্বরতারও শামিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি— সমাজে এ নির্মমতা ক্রমেই বাড়ছে। এ অবক্ষয় ঠেকাতে সরকার বৃদ্ধ পিতা-মাতার সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে আমরা এমনটিই দেখতে চাই।
খুন ও গুমসহ বিভিন্ন অপরাধে ছেয়ে গেছে দেশ। আমাদের সোনার বাংলায় তো এমনটি হওয়ার কথা নয়। তাহলে কেন হচ্ছে? স্কুলের একজন শিক্ষার্থীর হাতে নেশা জাতীয় দ্রব্য পৌঁছায় কেমন করে? সামাজিক আর ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো কি ধ্বংস হয়ে গেছে? ধর্মীয় শিক্ষা তো বাধ্যতামূলক করা আছে স্কুল পর্যায়ে। পরিবারেও তো রয়েছে ধর্মীয় আচারের অনুশীলন। তাহলে সেখান থেকে শিশুরা কি কোনো শিক্ষা নিচ্ছে না? নাকি আজকাল ছেলেমেয়েরা ঝুঁকে পড়ছে ফেসবুক, ইন্টারনেট, মোবাইল আর টেলিভিশনের দিকে! টিভি খুললেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধ আর অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানার ছবি দেখতে পাচ্ছে ছেলেমেয়েরা। এসব দেখে, ফেসবুকে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে চ্যাট করে, মোবাইলে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তারা যে বিপদের দিকে পা বাড়াচ্ছে সেটা তারা নিজেরাও জানে না। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে মাদক। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। আর বাবা-মা বৃদ্ধ হলে তাঁরা সন্তানের জন্য বোঝা হয় না—এটা আমাদের সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের আদর্শবান করে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমাদের জীবনে যে এর চেয়েও খারাপ কিছু ঘটবে না তার গ্যারান্টি কী?
ঢাকা
