চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত যানবাহনে প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মেয়াদান্তে গ্যাস সিলিন্ডার মেরামত ও বদলে ফেলার নিয়ম-কানুন চালক-মালিকদের অনেকেই মানছেন না। চট্টগ্রামে যানবাহনে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সূত্রের মতে, অধিকাংশ যানবাহনের চালক-মালিকরা এ ব্যাপারে চরম উদাসিনতা দেখাচ্ছে। এদের মধ্যে গণপরিবহনের চালক-মালিকদের সংখ্যাই বেশি।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীতে অটোরিকশা, টেম্পো, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারসহ মোট প্রায় ১৩ হাজার সিএনজি চালিত যানবাহন চলাচল করছে। এছাড়া মহানগরীর বাইরে চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলা ও বিভিন্ন শহরতলী এবং গ্রামাঞ্চলকে কেন্দ্র করে জেলা পুলিশের আওতায় চলাচল করছে প্রায় ২৩ হাজার টেক্সি, টেম্পো মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। চট্টগ্রামে যানবাহনকে সিলিন্ডারে সিএনজি ভরে সড়কে চলাচলের উপযোগী করতে চারটি অনুমোদিত কনভারসন সেন্টারের নাম জানা যায়। এগুলো হচ্ছে আগ্রাবাদ বেপারীপাড়ার ইন্ট্রিকা লিমিটেড, কালুরঘাট ও হালিশহর নয়াবাজার এলাকার নাভানা লিমিটেড, বহদ্দারহাট এলাকার সাউদার্ন এবং ইপিজেড এলাকার রহিম আফরোজ।
ইন্ট্রিকা লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মাহবুবুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, কোনো যানবাহনে সিএনজি সিলিন্ডার সংযোজনের পাঁচ বছর পর তাকে রি-টেস্টিং করে গ্যাস সিলিন্ডারের ত্রুটি শনাক্ত হলে তা বদলে ফেলা কিংবা মেরামতের মাধ্যমে তার ত্রুটি সারানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেখা গেছে সরকারের নির্দেশিত এই আইন মানার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সিএনজি চালিত যানবাহনের মালিক-চালকরা তাদের উদাসিনতা প্রদর্শন করেছেন। গত ১৭ মার্চ ফটিকছড়িতে একটি সিএনজি চালিত মাইক্রোবাসে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৪ জনের প্রাণহানির ঘটনার পর সিএনজি কনভারসন সেন্টারগুলোতে কিছু কিছু এধরনের যানবাহন রি-টেস্টিং এবং সিলিন্ডার বদলানোর জন্য আসছে। তাও এপর্যন্ত যে পরিমাণ যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তরিত হয়েছে তার সংখ্যার তুলনায় কনভারসন সেন্টারগুলোতে সম্প্রতি আসা যানবাহনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীতে গত ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনকে সিএনজি চালিত যানবাহনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া বিভিন্ন কোম্পানী একযোগে শুরু করেছে। ২০০৯ সাল থেকে রূপান্তরিত যানবাহনগুলোর রি-টেস্টিংয়ের জন্য রি-টেস্ট সেন্টারসমূহ খোলা হয়। এতোদিন রি-টেস্টিং সেন্টারগুলোতে যানবাহন খুব কমই আসতো। ফটিকছড়িতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চার যাত্রীর মৃত্যু এবং গোটা মাইক্রোবাস পুড়ে যাওয়ার ঘটনার পর ইন্ট্রিকার রি-টেস্টিং সেন্টারে প্রতিদিন ২৫/৩০টি গাড়ি আসছে। ইন্ট্রিকা কর্মকর্তা জানান, গত প্রায় দশ বছরে শুধুমাত্র ইন্ট্রিকাই চট্টগ্রামে প্রায় ৩০/৩৫ হাজার গাড়িকে সিএনজি চালিত গাড়িতে রূপান্তরিত করেছে। এই সংখ্যার তুলনায় পাঁচ বছরান্তে সিলিন্ডার রি-টেস্টিংয়ে আসা গাড়ির সংখ্যা খুব বেশি নয়। যদি অন্য কোনো খানেও তারা রি-টেস্টিং না করিয়ে থাকে তাহলে এসব অপরীক্ষিত সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে থাকবে। রি-টেস্টিংয়ের জন্য তারা গাড়ি প্রতি মাত্র ২ হাজার টাকা নিয়ে থাকেন বলে জানান তিনি। তার মতে, বিশেষ করে গণপরিবহনগুলোকেই প্রতিমাসে একবার অন্তত সিলিন্ডার চেকআপ করিয়ে নেয়া উচিত। এব্যাপারে কনভারসন সেন্টারগুলো প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে ফলোআপ কার্যক্রম চালালেও সাড়া কম বলে তার অভিমত।
চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষায় ১০ জন পরিদর্শক থাকলেও সিএনজি চালিত গাড়ীর সিলিন্ডার পরীক্ষায় কোনো বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ নেই বলে জানা গেছে। অন্য একটি সূত্র জানায় গাড়ির ফিটনেস এবং সিএনজি চালিত গণপরিবহনের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মহানগরীর বাইরের যানবাহনগুলোর মালিক-চালকরা আরো বেশি অসচেতন। ফলে সেগুলো আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গত ১৭ মার্চ ফটিকছড়িতে যে মাইক্রোবাসটি বিস্ফোরিত হয়েছিলো সেটি ভাড়া করা হয়েছিলো উপজেলার নাজিরহাট মাইক্রোবাস টার্মিনাল থেকে। খরচের পরিমাণ কম হলেও এই অল্প টাকা দেয়ার ভয়েই অনেক চালক-মালিক সিলিন্ডার পরীক্ষায় রি-টেস্টিং সেন্টারে যেতে চান না।
