স্থানীয় সরকারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নির্দলীয় হলেও এর ঠিক উল্টো চিত্র নির্বাচনী মাঠে। ভোটের মাঠে দলীয় প্রধানের ছবি আর শ্লোগান ব্যবহার না করা ব্যতিত কোন নির্দলীয় চিত্র পাওয়া যায়নি নির্বাচনে। ৪৫৮ উপজেলা পরিষদের ভোট গ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে ৪৫৫ উপজেলার ফল প্রকাশ করেছে তাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জয়ী হয়েছেন। মাত্র পাঁচটি উপজেলায় নির্দলীয় ব্যক্তিরা চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কারণে সহিংসতাও বেড়েছে।
বিভিন্ন মহলেই প্রশ্ন উঠেছে উপজেলা নির্বাচন শুধু নামেই নির্দলীয় রেখে লাভ কি হচ্ছে? নির্বাচনী সহিংসতা বাড়লেও দলীয় পরিচয়ের কারণে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পিছ পা হচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের লোকজন। চোখের সামনে অনিয়ম হতে দেখেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। এ জন্য আইন সংশোধনের পক্ষে কমিশনও।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রংপুরের তারাগঞ্জে আনিসুর রহমান, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে জানে আলম, মুকসুদপুরে আশরাফুল আলম শিমুল, বান্দরবানের থানছিতে ক্যাহদ্মা সিং এবং হবিগঞ্জের সদরে সৈয়দ আহমদুল হক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন নির্দলীয় পরিচয়ে। চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পঞ্চম ধাপে ২২১জন ভোটারদের কাছে নিজেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী পরিচয় নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চেয়ারম্যান হয়েছেন। ১৫৩ জন নিজেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে, ৩৫ জন জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে, ৩ জন জাতীয় পার্টির এবং ৪১ জন আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্রোহী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় শাহাদত হোসেন, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গাজী গোলাম মোস্তফা, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় রফিকুল ইসলাম রেনু, নেত্রকোনার খালিয়জুরীতে শামসুজ্জামান তালুকদার, গাইবান্ধার ফুলছড়িতে হাবিবুর রহমান , ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় মজনু মিয়া, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে আবু বকর মোহাম্মদ সিদ্দিক, দশমিনায় সাখাওয়াত হোসেন, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে রেজাউল করিম রাসেল,হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে আতর আলী মিয়া ও কক্সবাজারের মহেশখালীতে মোহাম্মদ হোছাইন ইব্রাহিম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দল তাদের সমর্থন না দেয়ায় তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছেন। বিএনপির সরাসরি সমর্থন নিয়ে বিজয়ী হওয়া ১৫৩ চেয়ারম্যানের বাইরেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বগুড়ার ধুনটের তৌহিদুল আলম, ঢাকা দোহারের কামরুল হুদা,নরসিংদী বেলাবোর আহসান হাবীব, শিবপুরের আরিফুল ইসলাম মৃধা, পাবনা ভাঙ্গুড়ার নুর মুজাহিদ, ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের এ বি এম বাদল আমিন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে কামরুজ্জামান কামরুল, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের গিয়াস উদ্দিন ও রাজশাহীর পুঠিয়ার আনোয়ারুল ইসলাম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
উপজেলা নির্বাচনের সময় বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের প্রার্থীদের হয়রানি করার অভিযোগ করলেও তা আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এসময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনাররা বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়। এখানে আইন অনুযায়ী কোন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ আমলে নেয়ার কোন সুযোগ নেই কমিশনের। তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে সহিংসতার পরে ক্ষোভ প্রকাশ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক রাজনৈতিক দলগুলোকে বলেছেন, দলীয় ভাবে নির্বাচন করতে চাইলে তাদেরই আইন সংশোধন করে নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে সহিংসতা সৃষ্টি করলে কমিশনের কিছুই করার থাকে না। শুধুমাত্র নির্বাচনী আইন লঙ্ঘিত হলেই নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে।
