শিল্পাঙ্গনে ‘চিত্রে সুচিত্রা’ প্রদর্শনী

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪১
আজ মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের ৮৩ তম জন্মদিন। সুচিত্রা সেন আমাদের এই বাংলাদেশেরই মেয়ে। বাড়ি পাবনা। তার শ্বশুরবাড়িও ছিল ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনায় এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার আসল নাম রমা দাশগুপ্তা। রূপালি পর্দায় যিনি সুচিত্রা সেন পরিচয়ে বাঙালির হূদয়ে চির আসন করে নেন। ১৯৭৮ সালে সেই যে চলচ্চিত্রের রূপালি অঙ্গন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন এরপর আর বড় পর্দায় দেখা যায়নি তাকে। তবুও তো বেঁচে ছিলেন বাংলার মানুষের এই স্বপ্নসুন্দরী। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের এক অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে কোটি ভক্তের হূদয় কাঁদিয়ে এ বছরের ১৭ জানুয়ারি পরপারে চলে গেলেন তিনি। সুচিত্রা সেনের মৃত্যু গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে ফেলে বাংলার দর্শকদের। শুধু বাংলা সিনেমার জগতেই নয়, উপমহাদেশে বাংলাদেশের এই মেয়েটির মত মহানায়িকার আসন আর কেউ অর্জন করতে পারেননি। অভিনয় ছেড়ে দেয়ার পর অন্তরালের জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও সারাজীবন রূপালি পর্দার নায়িকা হিসেবেই বিরাজ করেছেন দর্শকের হূদয়ে। সুচিত্রা সেন ভারতীয় বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের নায়িকা। অভিনয়ের পুরোটা কাল তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন, ছিলেন মানুষের আগ্রহের কেন্দ বিন্দুতে। তার অন্তরালের জীবন নিয়েও মানুষের মাঝে তীব্র কৌতূহল। কিন্তু নিজের পারিবারিক ও অন্তরালের জীবন নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা মেনে চলেছেন সুচিত্রা সেন। শুধু তিনিই নন তার একমাত্র মেয়ে চিত্রনায়িকা মুনমুন সেন, হালের নায়িকা দুই নাতনি রিয়া ও রাইমা সেন কেউই কখনো মুখ খোলেননি। এমনকি তার একান্ত ব্যক্তিগত চিকিত্সক, হাসপাতালের নার্স, পত্রিকার সাংবাদিক কেউই তার স্বেচ্ছা নির্বাস যাবার বিষয়টিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি। বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় এই নায়িকার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করেছেন সবাই। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো’- মোটর সাইকেলে উত্তম কুমার, পেছনে সুচিত্রা সেন। ‘সপ্তপদী’ সিনেমার সেই গান বাঙালি দর্শকের কাছে রোমান্টিক মুহূর্তের চিরন্তন একটি দৃশ্য। প্রেমের পথে অনিঃশেষ যাত্রার নায়ক-নায়িকা তারা। বাঙালি প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে এ চলা অন্তহীন। সেই যাত্রাপথের উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক জুটি তাই দর্শকের হূদয়ে পেয়েছে অমরত্বের মর্যাদা। সুচিত্রা সেন চলে গেলেন, নেই উত্তম কুমারও। কিন্তু বাঙালি দর্শকের হূদয়ে তাদের সেই যাত্রা যেন কোনদিনই শেষ হবার নয়। অভিনয়ে এক ঈর্ষণীয় স্থান দখল করেছিলেন সুচিত্রা সেন। লক্ষ লক্ষ পুরুষের হূদয়হরণ করেছিলেন। তার চোখের চাহনি হূদয়ে তোলপাড় তুলতো প্রতিটি যুবকের। মেয়েদের কাছে তিনি ছিলেন ফ্যাশন আইডল। তার বলার ভঙ্গি, হাসি, থুতনি উঁচু করে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকানো — এসব আজো ভুলতে পারে না ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শকরা। সুচিত্রা সেনের বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত গৃহবধূ। রমা বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান এবং তৃতীয় কন্যা। বাবা-মা, এক ভাই ও তিন বোনকে সাথে নিয়ে রমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনের বাড়িতে। পাবনাতেই তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা শুরু হয়। পাবনা মহাখালি পাঠশালায় শুরু এবং পরবর্তী সময়ে পাবনা গার্লস স্কুলে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর তার আর পড়াশোনা হয়েছে বলে জানা যায়নি। পাবনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরিবারে কলকাতায় পাড়ি দেন। পাবনা ভোকেশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও পাবনা সরকারি বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ের বিপরীতেই সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি। ১৯৪৭ সালে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় সুচিত্রা সেনের। দিবানাথ সেন ছিলেন গেন্ডারিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও অভিজাত ব্যক্তিত্ব দীননাথ সেনের নাতি। চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠায় দিবানাথের বাবা আদিনাথ সেনের সহযোগিতা পেয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ১৬ বছরের দাম্পত্যজীবন শেষে সুচিত্রা সেন ও দিবানাথ সেন আলাদা হয়ে যান। জন্মদিন উপলক্ষে প্রদর্শনী শুরু আজ সুচিত্রা সেনের জন্মদিন উপলক্ষে সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গন আজ আয়োজন করেছে সুচিত্রা সেনের ছবি নিয়ে বিশেষ প্রদশর্নী ‘চিত্রে সুচিত্রা’। বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ ২৮ জন চিত্রশিল্পীর ছবি স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে। গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের পরিচালক রুমী নোমান জানান, সচিত্রা সেনের মৃত্যুর পর গ্যালারি শিল্পাঙ্গন প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক চিত্রশিল্পী স্ব-উদ্যোগে তার ছবি আঁকতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আজ রবিবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ৩০ নম্বর সড়কে গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এই প্রদশর্নীর উদ্বোধন করবেন। বক্তব্য রাখবেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। অতিথি হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্য ব্যক্তিত্ব সারা যাকের ও গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং বাংলাদেশের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাউসুল আলম শাওন। দুই সপ্তাহের এই প্রদশর্নী চলবে ১৯ এপ্রিল দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। (বিশেষ নিবন্ধ ৯-এর পৃষ্ঠায়)