কর্ম পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কোনো শিল্পে কখনই গৌণ বিষয় নহে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, কিছু শিল্পকারখানা কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতের কথা না ভাবিয়া বর্তমান লাভ-লোকসানকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া তাহাই করিতেছে, জীবনকে ফেলিতেছে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের দুর্ঘটনায় যে হতাহতের ঘটনা ঘটিয়াছে তাহা সেই ইঙ্গিতই বহন করে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, কার্বন-ডাই অক্সাইড ভর্তি সিলিন্ডারের নির্গমন মুখ অজ্ঞতাবশত খুলিয়া ফেলিলে বিষক্রিয়ায় চারজন মারা গিয়াছে। অবশ্য এহেন দুর্ঘটনা নূতন কিছু নহে। গ্রিন পিস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর হিউম্যান রাইট্স-এর এক পরিসংখ্যান বলিতেছে, গত দুই যুগেরও কম সময়ে জাহাজ ভাঙ্গার কাজে নিয়োজিত প্রায় ১০০০ শ্রমিক বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করিয়াছে। পঙ্গুত্ব বরণ করিয়াছে আরও কয়েক হাজার। এইসব দুর্ঘটনার সব খবরই যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত হইয়াছে তাহা অবশ্য নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না।
পরিবেশের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে বিধায় উপকূলে জাহাজ ভাঙ্গার কাজ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে অনেক দেশেই। কিন্তু বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে এই শিল্প বন্ধ করা সম্ভব হয় নাই। দেশের প্রায় ৩০ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পে কর্মরত। মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ ইস্পাতের যোগান দিয়া থাকে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। প্রত্যেক বত্সর বিপুল পরিমাণ রাজস্বের উত্সও এই শিল্প। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিএ) এর সূত্রমতে মোট ১৭৯টি প্রতিষ্ঠান জাহাজ ভাঙ্গার ব্যবসায় নিয়োজিত রহিয়াছে । এ শিল্পে প্রবেশ করিবার অন্যতম পূর্বশর্ত হইল এই সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ। সংগঠনটি পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তির আওতাভুক্ত। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হইল, সংগঠনের কতিপয় সদস্য এবং সদস্য নহে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করিয়া অধিক মুনাফার লোভে উপকূলের যথেচ্ছ ব্যবহার করিতেছে, গাছপালা কাটা হইতেছে নির্বিচারে, শ্রম আইনের যথাযথ অনুসরণ না করিয়া শিশু শ্রমিক নিয়োগ এবং তাহাদের দিয়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হইতেছে। এইসব শিশু শ্রমিকের ১০.৯৪ শতাংশের বয়স ১৫ বত্সরের নিচে। প্রায় বেশীরভাগ শ্রমিকই প্রশিক্ষণ পায় না বলিয়া দুর্ঘটনা এই শিল্পে অতি স্বাভাবিক একটি ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
পরিত্যক্ত জাহাজ হইতে নিঃসরিত রাসায়নিক বর্জ্য যথেচ্ছভাবে উপকূলে ফেলার কারণে ওই অঞ্চলে প্রাণিকুলের অস্তিত্ব বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে নিপতিত। জাহাজ ভাঙ্গার ফলে উদগীরণ ঘটে কার্বন, সীসা, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়াম কণার, যেইগুলি বায়ুতে মিশিয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসফুসসহ শরীরের নানা অঙ্গে অ্যাজমা ও মারাত্মক সব রোগের সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ২০০৬ অনুযায়ী জাহাজ কাটিবার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ রোধ করিবার দায়িত্ব মালিক ও আমদানিকারকগণের। কিন্তু জাহাজ মালিকগণ কোনোরকম বর্জ্য নিষ্কাশন না করিয়াই অনুন্নত দেশগুলির কাছে পরিত্যক্ত জাহাজ বিক্রয় করিয়া দেয় যাহা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও সমুদ্র পরিবেশ সংক্রান্ত হংকং চুক্তির অবমাননা। পরিবেশসম্মত শিল্প ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করিতে পারিলে ঝুঁকির মাত্রা দিন দিন বাড়িতেই থাকিবে। এ জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের যেমন বিকল্প নাই তেমনি প্রয়োজন রহিয়াছে পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা বিষয়ক সামাজিক সচেতনতার। এইক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রশ্নটিও উপেক্ষা করিবার মত নহে।
