১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠন করে। ১৭ এপ্রিল এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। মুজিবনগর সরকারই বাংলাদেশের প্রথম সরকার। তার এই সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। এই প্রথম সরকারের আগে কেউ কোন সরকার গঠন করেননি বা কারো সরকার গঠনের এখতিয়ারও ছিল না বিধায় প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগে আর কোন রাষ্ট্রপতি ছিল না বা থাকার প্রশ্নই আসে না। তাই বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই অন্য কেউ না। যারা বলেন যে জিয়াউর রহমান প্রথম রাষ্ট্রপতি তাদের কাছে প্রশ্ন তিনি কোন্ সরকারের রাষ্ট্রপতি? তিনি কি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন? তাকে কারা রাষ্ট্রপতি বানিয়েছেন। তিনি ঐ সময় রাষ্ট্রপতি হলে মেজরের চাকরিতে বহাল থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর হাতে থেকে চারটি পদোন্নতি নিয়ে কিভাবে মেজর জেনারেল হলেন? ইতিহাস নিয়ে এখন মিথ্যাচার খুবই লজ্জাকর। অনুগ্রহ করে ইতিহাস বিকৃত করবেন না। তারেক রহমান লন্ডনে বসে একটি উদ্ভট তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। এই উদ্ভট তত্ত্বটি আবার বেগম খালেদা জিয়াও সানন্দে গ্রহণ করে তিনিও ঘোষণা করলেন যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি খালেদা জিয়ার প্রচণ্ড বিদ্বেষ অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছে। খালেদা জিয়া তার প্রকৃত জন্মদিন কয়েকবার পরিবর্তন করে ১৯৯৬ সাল থেকে ঘোষণা দিলেন যে ১৫ই আগস্ট তার জন্মদিবস, আর ঐ ১৫ই আগস্টই হল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহাপ্রয়াণ দিবস। ১৫ই আগস্ট দেশদ্রোহীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে। এই দিনটি জাতীয় শোক দিবস। এই দিন সমস্ত জাতি সমস্ত বিশ্ব শোকে মুহ্যমান থাকে আর এই শোকের দিনে খালেদা জিয়া কেক কেটে জন্মদিন পালন করে আর পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠে, আর তার সাগরেদরা বলে উঠে হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ। আমার প্রশ্ন হল খালেদা জিয়ার বঙ্গবন্ধুর প্রতি এত বিদ্বেষ কেন?
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি না। জিয়াউর রহমান প্রথম রাষ্ট্রপতি। এত নিষ্ঠুর মিথ্যাচার কেন? যে বঙ্গবন্ধু তার জীবনের প্রতিষ্ঠাতা সেই বঙ্গবন্ধুর সমস্ত মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দিতে খালেদা জিয়া আজ উদ্যত কেন? এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে? এত বড় অকৃতজ্ঞতার নিদর্শন পৃথিবীতে আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা-মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের জন্মদাতা, বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতির পিতা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। খালেদা জিয়ার ও তার পুত্র তারেকের অপচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না। শুধু ‘৭১ সাল নয়, বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সাল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে এসেছেন। এই ধারাবাহিক সংগ্রামের পথে তিনি ১৮টি বছর কারা বরণ করেন। দুইবার তিনি ফাঁসির মঞ্চে বাঙালির জয়গান গান। বাঙালির স্বাধীনতার জন্য তিনি বার বার মৃত্যুর ঝুঁকি নিতেও পিছপা হননি। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন করে তিনি আগরতলা মামলার ১নং আসামী হয়ে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ান। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের কারাগারে ফাঁসির দিনক্ষণ গুনেছেন। ’৭০-এর নির্বাচনে তিনি বাঙালিদের ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী বাঙালিদের আক্রমণ করলে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে অর্থাত্ ২৫ মার্চ রাত ১২ টার পরে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পেয়ে রাজারবাগের পুলিশ সাথে সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরু হয়। এরপর মুক্তি বাহিনী সারা বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করে। মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে নেয়। ভারতে গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নেয়। ৯ মাস যুদ্ধ করে মিত্র বাহিনীর সাথে যৌথ যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে ও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনী আর যুদ্ধ করতে না পেরে যৌথ বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে। এইভাবে বঙ্গবন্ধুর ২৪ বছরের নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, মুক্তিযোদ্ধারা, সমস্ত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি করে আনন্দ প্রকাশ করে ও রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে জাতির পিতাকে সংবর্ধনা দেয় বাঙালি জাতি সমস্ত বিশ্ব অবাক হয়ে আনন্দিত হয়ে তা প্রত্যক্ষ করে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কাছে আমার অনুরোধ আপনারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে বার বার ইতিহাস বিকৃত করেছেন। জাতিকে বিভ্রান্ত করেছেন। নতুন প্রজন্মকে মিথ্যা ইতিহাস শিখিয়েছেন। আর আমরা তা সংশোধন করেছি। আপনারা পুনরায় ইতিহাস বিকৃত করা থেকে বিরত থাকুন। দোহাই আপনাদের আপনারা আপনাদের অপকর্ম বন্ধ করুন।
লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা ও ব্যাংকার
