কাউন্সিলর অফিসগুলোতেই প্রতারক চক্রের আড্ডা

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫২
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অফিসগুলো এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত! সাবেক কাউন্সিলররা এখন আর এই অফিসে আসেন না। নামে মাত্র একজন সচিব থাকলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এই পরিত্যক্ত অফিসগুলোতেই গড়ে উঠেছে এক ধরনের প্রতারকচক্রের আড্ডাখানা। সাধারণ মানুষ যে কোন দরকারে চেনে এই ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অফিসকেই। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোন সেবা তো পাচ্ছেই না, উল্টো প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে বিপদে পড়ছেন। সাধারণ নগরবাসীর অভিযোগ শোনার কেউ নেই। গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় শাহবাগের পরীবাগে ২১ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় কয়েকজন লোক বসে আছেন। সেখানে ঢুকতেই মধ্যবয়সী একজন বলেন, ‘কী লাগবে? নাগরিক সনদ বা জন্ম সনদ।’ তার কাছে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি পরিচয় লুকান। একপর্যায়ে কেটে পড়েন। কার্যালয়ের সচিব সেকান্দার আলীকেও পাওয়া যায়নি। স্টাফ পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, সচিব হয়তো ‘নগর ভবনে’ গেছেন কোন কাজে। আর ডিসিসি দুই ভাগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই কার্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন কাউন্সিলর।’ সচিব সেকান্দার আলী ইত্তেফাককে বলেন, এই ওয়ার্ডের যে কোন ধরনের সনদ-সংক্রান্ত প্রয়োজনে অঞ্চল-১ কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। তিনি বলেন, এই কার্যালয়টি ফুলবাড়িয়ার ‘নগর ভবনে’র ১০ তলায়। এই অফিস থেকে এখন আর কোন সনদ দেয়া হয় না। কিন্তু সমস্যা হল সেই অঞ্চল-১ কার্যালয় কোথায় সেটা স্থানীয় লোকজন জানেন না? এমন চিত্র এখন সবগুলো কাউন্সিলর অফিসে। কেবল নাগরিক সনদপত্রই নয়, জন্মনিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশের সনদ, পাসপোর্টের ফরম, ছবি সত্যায়নসহ নগরবাসীকে নানা সমস্যায় যেতে হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে। ৯২টি ওয়ার্ডই এখন কাউন্সিলর শূন্য। ‘নগর ভবনে’ গিয়েও মানুষ সমাধান পাচ্ছে না। আর সাধারণ জনগণ তো প্রশাসকের কাছে যেতে পারেন না। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি একেকটি কাউন্সিলর কার্যালয়ে গিয়ে সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন স্কুলে গত দুই-তিন মাস ধরে ভর্তির কার্যক্রম চলায় জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন অভিভাবকরা। সেই সুযোগে কাউন্সিলর কার্যালয়গুলোতে নাগরিক সনদ ও জন্ম সনদ দেয়ার নামে একটি চক্র বাণিজ্য শুরু করেছে। ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা করে নিয়ে দেয়া হচ্ছে একটি সনদ। এ নিয়ে কারো কাছে অভিযোগও করা যাচ্ছে না। ঢাকা সিটি করপোরেশনে (ডিসিসি) সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০০২ সালের এপ্রিলে। নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকা তার মেয়াদ শেষ করেন ২০০৭ সালের এপ্রিলে। এরপর আরো ৬ বছর পার হয়ে গেলেও নির্বাচনের কোনো খবর নেই। এরই মধ্যে নাগরিকসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলে ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিসিসি ভেঙে দুই ভাগ করা হয়েছে। বর্তমানে বিভক্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চলছে আমলা দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিলর শূন্য দুই সিটি করপোরেশনের ৯২টি ওয়ার্ড। এ অবস্থায় সমস্যার কথা বলার মতো দায়িত্বশীল কাউকে পাচ্ছেন না নগরবাসী। ফলে দোরগোড়ার পরিবর্তে সেবা আরো দূরে সরে গেছে। রাস্তা মেরামত ও আধুনিকায়ন, মশা নিধন, সড়কবাতি স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজও গতি হারিয়েছে। বিলুপ্ত ডিসিসির ডজনখানেক কার্যালয় ঘুরে কোনোটিতেই সাবেক কাউন্সিলরের খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেবাগ্রহীতারা সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কিংবা কার্যালয় ঘিরে গড়ে ওঠা চক্রের খপ্পরে পড়ছেন। অসাধু ব্যক্তিরা স্বাক্ষর জাল করে তারাই সনদ দিয়ে দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো কার্যালয়ের স্টাফরা ‘নগর ভবন’ থেকে সনদ স্বাক্ষর করিয়ে এনে দিচ্ছেন। এর বিনিময়ে তারা নিচ্ছেন বড় অংকের টাকা। বাধ্য হয়েই তাদের টাকা দিতে হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘নাগরিকত্বের সনদের জন্য লোকজন ওয়ার্ড অফিসগুলোতে ভীড় করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমাদেরই বা কি করার আছে।’ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোট্ট একটি সনদের জন্য সেই উত্তর বা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন অফিসে যেতে হচ্ছে। এর জন্য সময় যেমন যাচ্ছে, তেমনি অর্থের অপচয়ও করতে হচ্ছে। তাও একদিনে গেলে কাজ হচ্ছে না। এর জন্য একাধিকবার যেতে হচ্ছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে যে কাজ ৫ মিনিটে হয়ে যেত এখন সেই কাজ করতে উত্তর বা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে যেতে হচ্ছে ৫ দিন। এসব কারণে বিরক্ত হচ্ছেন সাধারণ নগরবাসী।