কেরানীগঞ্জে তীব্র গ্যাস সঙ্কট চলছে। জ্বলছে না কয়েক লাখ চুলা। এতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন গৃহিণীরা। উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ গৃহিণী গভীর রাতে উঠে রান্নাবান্না শেষ করছে।
গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায় উত্পাদন। লোকসান গুণতে হচ্ছে মালিকদের। সদ্য গড়ে ওঠা তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ডায়িং প্রিন্ট ও লৌহজাত শিল্প কারখানাগুলোরও একই অবস্থা। অথচ কেরানীগঞ্জ উপজেলায় অর্ধ-লক্ষাধিক অবৈধ সংযোগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে জেনারেটর দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এই ফাঁকে গ্যাস সিলিন্ডার, জ্বালানি কাঠ, কেরোসিন ও ডিজেল ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। কেরানীগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে আগানগর, জিনজিরা, কালিন্দি ও কলাতিয়া ইউনিয়নের লোকজন মোটামুটি গ্যাস পাচ্ছে। আর বাকি ৮টি ইউনিয়নের মানুষ নামেমাত্র গ্যাস পাচ্ছে। এই উপজেলায় ২৫ লক্ষাধিক লোকের বসতি। এর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতি হলো শুভাঢ্যা ইউনিয়ন। সম্প্রতি হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, চণ্ডিতলা, পারগেণ্ডারিয়া, আইন্তা ও বেয়ারা এলাকার হাজার হাজার মানুষ গ্যাস সঙ্কটের কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে একাধিকবার বুড়িগঙ্গা চীন-মৈত্রী সেতুর যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এ ছাড়া খেজুরবাগ, চর খেজুরবাগ, কালিগঞ্জ, চর কালীগঞ্জ, আমিনপাড়া, চুনকুটিয়া, কৈবত্যপাড়া, চর কুতুব, জিয়ানগর, ঝাউবাড়ি, বেগুনবাড়ি, শুভাঢ্যা পূর্বপাড়া এলাকার আবাসিক ও শিল্পকারখানাগুলোর উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিল্পকারখানার মালিকরা শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিচ্ছেন। অনেক কারখানা ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে নেয়া হচ্ছে।
গ্যাস সঙ্কটের ব্যাপারে শাক্তা ইউনিয়নের বাসিন্দা নয়ন তারা বেগম ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘন্টা গ্যাস থাকে না। সকাল ৭ টার আগেই গ্যাস চলে যায়। রাত ৩ টায় ঘুম থেকে উঠে রান্না-বান্নার কাজ শুরু করতে হয়। বিকাল ৩টা থেকে গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে। এভাবে প্রতিদিনই গ্যাসের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়।
কলাতিয়ার রুবিনা বেগম পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, ঘুম থেকে উঠে আমাকে যেতে হয় স্কুলে চাকরি করতে। ঘরে থাকে এক ছেলে এক মেয়ে। তাদের নাস্তাটা পর্যন্ত তৈরি করে স্কুলে যেতে পারি না। বাধ্য হয়ে তাদের হোটেলে নাস্তা খাওয়ার টাকা দিয়ে যেতে হয়। এতে করে দেখা গেছে আমার বেতনের অধিকাংশ টাকা হোটেলের নাস্তার জন্য ব্যয় হয়ে যায়। তাছাড়া আগে যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য ছিল ১২শ’ টাকা। বর্তমানে ওই গ্যাস খরিদ করতে হয় ১৯শ’ টাকায়।
কালীগঞ্জের গৃহবধূ শিরিন আক্তার বলেন, আমাদের তৈরি পোশাক কারখানায় ২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। তারা আমাদের বাড়ির রান্না খায়। আমাদের ভবনে গ্যাস না থাকার দরুন বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে ৩ বেলা কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। এতে আমাদের ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে অনেক।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জে গড়ে উঠেছে ১০ সহস্রাধিক তৈরি পোশাক কারখানা। এর মধ্যে অধিকাংশ কারখানায়ই তৈরি হয় জিন্সের প্যান্ট, শার্ট, জ্যাকেট ও জাম্পার। ওইসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা বলেন, জিন্স সামগ্রী তৈরি হওয়ার পর ধোলাই করতে হয় ডাইং ফ্যাক্টরিতে। তারা অভিযোগ করে বলেন, মফস্বলের পাইকারদের গ্যাস সঙ্কটের কারণে সময় মতো তৈরি পোশাক সরবরাহ করতে পারছি না। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী রোজার মৌসুমে ব্যবসা ভাল হবে না।
তিতাস গ্যাস এ্যান্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানির ঢাকা জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, কেরানীগঞ্জে অর্ধ-লক্ষাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। যার কারণে বৈধ সংযোগকারীরা গ্যাস পাচ্ছে না। বরাদ্দকৃত গ্যাস সরবরাহের কিছু ক্ষণের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে তিতাস গ্যাস এ্যান্ড ট্রান্সমিশন জিনজিরা জোন-৫-এর প্রকৌশলী সত্যজিত্ ঘোষ বলেন, কেরানীগঞ্জে যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গ্রাহকরা সে পরিমাণ পাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর কেরানীগঞ্জসহ সারাদেশের গ্যাস সমস্যার জন্য অবৈধ গ্যাস সংযোগকে দায়ী করেছেন। ইত্তেফাককে তিনি জানান, সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ সংযোগগুলো। সরবরাহ পাইপলাইন বসানোর সময় এলাকার একটি হিসাব অনুযায়ী পাইপ বসানো হয়েছে। কিন্তু যত্রতত্র অবৈধ সংযোগের কারণে সরবরাহ লাইন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।
