চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, নানা অপরাধ-অনিয়ম এবং ভোট কেন্দ্র দখলের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যেসব উপজেলায় প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ভোট কেন্দ্র দখলে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সহিংসতা ও অনিয়ম সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ ও কমিশনে দেয়া প্রার্থীদের অভিযোগকে ভিত্তি ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) ১৩ আইন মোতাবেক রবিবার পত্রিকার ৮০টি প্রতিবেদনসহ প্রায় দেড় শতাধিক অভিযোগ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনী অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। কোন অভিযোগ তামাদি হয় না। যারা নির্বাচনী অপরাধে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা, অনিয়ম, জাল ভোট প্রদান, রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল প্রদান, নির্বাচন পরবর্তীতে ভোটারদের বাড়ি-বাড়ি হুমকি-ধামকির বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে অস্বস্তিতে আছে কমিশন। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত ৪৫৮টি উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে সিল মারা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, খুন, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনসহ সব অনিয়মই ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও রয়েছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের আগের দিন ভোট কেন্দ্র দখলকারীদের উপর গুলির নির্দেশ দেয়ার পরও কেন্দ্র দখল ঠেকানো যায়নি। বরং উপজেলা নির্বাচনে প্রথম দুই ধাপের চেয়ে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে বেশি কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আঘাত পড়ে। কমিশন বলছে, আইনের দুর্বলতার কারণে ও মাঠ কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক সময়ে সঠিক তথ্য তারা কমিশনে পাঠায়নি। এ কারণে অনেক অভিযোগ জানার পরও কমিশন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। এই অবস্থায় কমিশন যেসব পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ্য সিল মারার ছবি প্রকাশ পেয়েছে সেগুলোতে এবং অনিয়ম প্রক্রিয়ায় জড়িতদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ইসি সচিবালয় থেকে পত্র-পত্রিকার সংবাদ বিশ্লেষণ করে ফাইল প্রস্তুত করার নির্দেশ দেয়া হয়।
গতকালই গণমাধ্যমের নাম উল্লেখের পাশাপাশি প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম যুক্ত করে পৃথক ৮০টি ঘটনা তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসারকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের সহকারী সচিব মোহাম্মদ আশফাকুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠির অনুলিপি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে। কোন কোন চিঠিতে ৩ দিনের মধ্যে ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। আবার কোন কোন চিঠিতে ৭ দিনের সময়ও দেয়া হয়েছে। তবে শুধু গণমাধ্যমের প্রতিবেদন নয়, যেসব ভুক্তভোগী কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন, সেগুলোও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এ ধরনের চিঠির সংখ্যা অর্ধশতাধিকের মতো।
একাধিক নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে জানান, নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বা নির্বাচনী অনিয়মে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছিলেন তাদের কাউকে কাউকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কমিশন ভালো উদ্যোগ নিলেও অভিযুক্তদের দিয়ে তদন্ত করে কার্যত কোন ফল মিলবে না।
