কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ২৭ কেজি ৭৬৫ গ্রাম স্বর্ণালংকার ও নগদ প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা আটক করেছে বিজিবি। শহরের পৌর এলাকার লামার চিরিঙ্গার বিমানবন্দর সড়কের নন্দরাম ধরের বাসায় সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্বর্ণালংকার আটক করা হয়। অভিযানকালে বিজিবি সদস্যরা হামলার শিকার হলে তারা গুলি করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও মহাজন নন্দরাম ধরকে আহত অবস্থায় এবং তার দুই ছেলে পলাশ ধর ও সুমন ধরকে অক্ষত অবস্থায় গ্রেফতার করে। এদিকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও মহাজনকে আটক করার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার সকাল ১১টা থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছে কক্সবাজার জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতি।
চকরিয়ার অভিযানে নেতৃত্বদানকারী বিজিবি কক্সবাজার ১৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম জানান, গোপন খবর পেয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী নন্দরাম ধরের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। বাড়ি থেকে নগদ ১১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ টাকা ও বস্তাভর্তি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। সেইসঙ্গে আটক করা হয় মহাজন ও তার দুই ছেলেকে। তিনি জানান, এসব স্বর্ণালংকার চকরিয়া থানায় জমা দেয়ার পর তা পরিমাপ করে দেখা যায় এতে ২৭ কেজি ৭৬৫ গ্রাম স্বর্ণালংকার রয়েছে। চকরিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ ফরহাদ জানান, এ ব্যাপারে স্বর্ণ চোরাচালান ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মহাজনকে আটক করার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছে কক্সবাজার জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতি। সোমবার সকাল ১১টায় ধর্মঘট শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে চকরিয়ায় প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জুয়েলারি মালিক ও স্বর্ণ বন্ধক প্রদানকারীরা।
মহাজন নন্দরাম ধরের স্ত্রী পারুল রানী ধর অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামী লাইসেন্স নিয়েই মহাজনী ব্যবসা করেন। তাদের ঘর থেকে উদ্ধার করা স্বর্ণালংকার স্থানীয় গ্রামবাসীর বন্ধকী স্বর্ণ। বিপদে-আপদে পড়ে গ্রামের নারীরা মহাজনের কাছে স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখেন, পরে টাকা পরিশোধ করে তা ফেরত নিয়ে যান। তিনি বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবেই এ ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। কক্সবাজার জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি ঝন্টু ধরের অভিযোগ, লাইসেন্সধারী বৈধ ওই মহাজনকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এ অভিযান চালিয়েছে বিজিবি ও পুলিশ।
স্বর্ণ উদ্ধারের খবর জানাজানি হওয়ার পর ভীড় বাড়তে থাকে চকরিয়া থানায়। যেখানে ওই মহাজনের কাছে সোনার গহনা বন্ধক রেখেছেন এমন লোকজনও ছিলেন। তাদের দাবি, প্রয়োজনের কারণে তারা মহাজনের কাছে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছেন। আটক স্বর্ণ ফেরত পেতে তারা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। চকরিয়া জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি সুনন্দ ধর জানান, মহাজন নন্দরাম ধর একজন বৈধ ব্যবসায়ী। হীন উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে এ অভিযান চালানো হয়।
চকরিয়া পৌর শহরে শতাধিক মহাজন রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ বন্ধক রেখে মোটা সুদে অর্থলগ্নি করে আসছেন। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও অসহায় লোকজন চিকিত্সা, মামলা-মোকদ্দমা কিংবা অন্যকোন বিপদে পড়ে মহাজনদের কাছ থেকে মাসে শতকরা ৫ ভাগ সুদে ঋণ নিয়ে থাকেন। যা বছরে হয় আসলের শতকরা ষাট ভাগ। প্রতি মাসে সুদের টাকা পরিশোধ করতে হয়। অন্যথায় বছরশেষে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ দিতে হয়। একবছর অতিক্রান্ত হলে সুদের চাপে বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত নেয়ার আর আগ্রহ থাকে না বন্ধকদাতার। ফলে সেই স্বর্ণ মহাজনেরই হয়ে যায়। সাধারণত ১৮/১৯ মাসেই আসলের সমান সুদ আদায় করে মহাজনেরা। এভাবে মহাজনী ব্যবসা করে স্বল্প সময়ে ধনপতিতে পরিণত হন তারা। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন জানান, একজন মহাজনের ঘরে এতো স্বর্ণ থাকতে পারে তা অবিশ্বাস্য। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন জানিয়ে বলেন, এখন থেকে সব মহাজনকে আইনের আওতায় আনা হবে।
চকরিয়া থানার ওসি বলেন, উদ্ধারকৃত গয়নাগুলো বন্ধকি। আটককৃত তিনজনকে গতকাল বিকালে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিজিবি মহাজন নন্দরাম ধরের বাড়ির দরজা ভেঙ্গে ঢুকে তার পরিবারের সদস্যদের বেধড়ক মারধর করেছে। এসবের ছবি তুলতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ। বিজিবি সদস্যরা তার ক্যামেরা এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছে। তবে বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল খন্দকার সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই সাংবাদিকের ক্যামেরা ও মোবাইল ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
নন্দরাম ধরের স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, উদ্ধার করা স্বর্ণালংকারগুলো বিভিন্ন লোকজনের বন্ধকি স্বর্ণ। পুত্র পলাশ ধরের স্ত্রী উর্মি ধর (২৬) বলেন, বিজিবি সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে আমাদেরকে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে শরীর থেকে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিয়েছে। আমার শ্বশুর, স্বামী ও দেবরের বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকলেও তারা সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করেছে আমাদের সাথে। চকরিয়া উপজেলা জুয়েলারি সমিতির সভাপতি রতন বরণ দাশ ও সাধারণ সম্পাদক সুলাল কান্তি সুশীল বলেন, নন্দরাম একজন বৈধ ব্যবসায়ী। তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা স্বর্ণগুলোও বৈধ। এসব স্বর্ণ মূলত বিভিন্ন লোকজন বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছেন। গতকাল বিকালে চকরিয়া উপজেলা জুয়েলারি সমিতির পক্ষ থেকে সকল সদস্য ও তাদের পরিবারের নারী সদস্যরা উপজেলা পরিষদের সামনে প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন। তারা দাবি করেন, বিনাশর্তে মহাজন ও তার ছেলেদের ছেড়ে দিতে হবে এবং সকল স্বর্ণ ফেরত দিতে হবে। এ সময় উপজেলা পরিষদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম তাত্ক্ষণিক উপস্থিত হয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।
ব্যবসায়ী নন্দরামের বন্ধকি স্বর্ণ ফেরত না দিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
চট্টগ্রাম অফিস : কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও স্বর্ণতারা জুয়েলার্স এর মালিক মহাজন নন্দরাম ধরের উপর প্রশাসন কর্তৃক অন্যায়ভাবে বন্ধকি স্বর্ণ ও দোকানের স্টকের স্বর্ণ জব্দ ও পরিবারের সবাইকে হয়রানিমূলক আটক করার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) চট্টগ্রাম শাখার নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন।
গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে সমিতির সভাপতি মো. নুরুল আবছার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র ধর বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে স্বর্ণ ব্যবসায়ী নন্দরামকে মুক্তি ও জব্দকৃত বন্ধকি স্বর্ণ ফেরত না দিলে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি চট্টগ্রাম শাখার পক্ষ থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলনসহ বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি কক্সবাজার জুয়েলার্স সমিতি যে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি দিয়েছে তার সাথে সংহতি প্রকাশ করে কক্সবাজার জুয়েলার্স সমিতির সাথে যৌথভাবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
