মাতুয়াইলে গড়ে উঠেছে বর্জ্য পণ্যের বাজার

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:১৯
যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়ক। এই সড়কের পাশেই মৃধাবাড়ি। জায়গাটি পরিচিতি পেয়েছে ময়লার রাস্তা নামে। এই রাস্তা ধরে একটু সামনে গেলেই ওয়েস্ট ডাম্পিং স্টেশন। পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। রাজধানীর মাতুয়াইলে সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার এই জায়গায় গড়ে উঠেছে বর্জ্য পণ্যের বাজার। প্রায় দুই হাজার পরিবার প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনার ভিতরে জীবিকার সন্ধান করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শেখ মোহাম্মদ জাভেদ ইকবাল বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা আছে। আমরা বর্জ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পুনঃব্যবহারের (রিসাইকেলিং) উদ্যোগ নিয়েছি। এর অংশ হিসেবে মাতুয়াইল ওয়েস্ট স্টেশনে মিথেন গ্যাস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বর্জ্য পুনঃব্যবহারের জন্য মানুষের সচেতনতা জরুরি।’ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন তিন শতাধিক গাড়ি বর্জ্য ফেলে এই ডাম্পিং স্টেশনে। ময়লা-আবর্জনা নিয়ে ট্রাক আসলেই ভিড় করে একঝাঁক ছিন্নমূল মানুষ। অভাবী এসব মানুষ বর্জ্যের ভেতরেই জীবিকার পথ খোঁজেন। রাত পোহানোর আগেই ভিড় জমে যায়। কাজলা, ধলপুর, মতিঝিল, কমলাপুর, মৃধাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ বর্জ্যের মধ্যে নানা জিনিস খোঁজেন। মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনে লোহা বা টিনের টুকরা, সাদা প্লাস্টিক, পলিথিন, গরু-মহিষের শিং ও হাড় সবচেয়ে মূল্যবান। এখান থেকে সংগ্রহ করা হয় কাগজ, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির বর্জ্য, ভাঙ্গা কাঁচ, কাঠ, জুতা-স্যান্ডেল, ব্যবহূত সিরিঞ্জ, রক্ত ও স্যালাইনের ব্যাগ, প্রক্রিয়াজাত তরল দুধের পলিথিন, প্লাস্টিক বোতলসহ প্রায় ৩০ ধরনের জিনিস। এগুলো বেচাকেনার জন্য ডাম্পিং স্টেশনের আশপাশে গড়ে উঠেছে বর্জ্য পণ্যের বাজার। ছিন্নমূল মানুষের কাছ থেকে এগুলো সংগ্রহ করে হকাররা বিক্রি করেন দোকানে। আরেক দল ব্যবসায়ী এগুলো দোকান থেকে সংশ্লিষ্ট কারখানায় পাঠান। গতকাল সোমবার সকাল গড়িয়ে দুপুর। একের পর এক বর্জ্যবাহী গাড়ি আসছে মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনে। নারী-পুরুষ ও শিশুদের ছোটাছুটি। মাথায় কাপড় পেঁচানো, পায়ে শক্ত জুতো, হাতে লাঠি কিংবা দা। অনেকের সঙ্গে কাজে ব্যস্ত বর্জ্য সংগ্রহকারী হনুফা বেগম। ব্যস্ততার মাঝে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করি। বেশি কাজ করতে পারলে দৈনিক দেড় শত থেকে আড়াই শত টাকা পাই। আর কম কাজ করলে এক শত থেকে দেড় শত টাকা পাই। মাসিক তিন হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিয়ে তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছি। জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা নেই বলে স্বামী-স্ত্রী একই কাজ করছি।’ কথা হয় কাজলার রিজিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করি। অতি অল্প বয়সে বর্জ্য সংগ্রহকারী হিসাবে কাজ শুরু করলেও এখন হকার। বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করে দোকানে বিক্রি করি। প্রতিমাসে রোজগার সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা। এদিয়ে সংসার চলে না বলে ধারদেনা করতে হয়। ঢাকার বর্জ্য অপসারণ করতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মাতুয়াইলে প্রায় দুইশ একর জমির ওপর ওয়েস্ট ডাম্পিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। এখানে বর্জ্য ফেলা হয়। আশপাশের এলাকায় সব সময়ই দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায়। বর্জ্যের গ্যাসের কারণে স্টেশনের ভেতরে কখনো আগুন লেগে যায়। সংরক্ষিত এ এলাকায় সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। নানামুখী ঝুঁকির পরেও বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন এসব ছিন্নমূল মানুষ। নিজেদের সমস্যা প্রসঙ্গে মাতুয়াইলের বর্জ্য সংগ্রহকারীরা জানান, অনেক কষ্টে বর্জ্য থেকে আহরিত জিনিসের ন্যায্য দাম পান না তারা। একজন সক্ষম বর্জ্য সংগ্রহকারী সপ্তাহে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এদিয়ে ৫ থেকে ৬ সদস্যের পরিবারের খরচ মেটানো কঠিন। মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, বর্জ্য সংগ্রহকারীদের সমস্যার শেষ নেই। ঘরে শিশুদের দেখাশোনার কেউ থাকে না বলে বাধ্য হয়ে বর্জ্য সংগ্রহকারী নারী-পুরুষরা শিশুদের সঙ্গে নিয়ে কাজে বের হন। ভোর ৫টার মধ্যেই বের হন ঘর থেকে। বর্জ্য সংগ্রহকারীদের এ শিশুদের লেখাপড়ার জন্য মাতুয়াইলে বেসরকারি সংগঠন গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছে। এছাড়া অন্য কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।