কালের বিবর্তনে হাজার বছরের সেই বাঙালি সংস্কৃতি আজ নিজ গৃহে পরবাসীর মতো কোণঠাসা হতে হতে একদিনের অনুষ্ঠানমালায় এসে ঠেকেছে। কিন্তু কেন এমন হলো তার সদুত্তর দেওয়া কঠিন। যদিও অনেকে বলেন এর জন্য দায়ী বিশ্বায়ন।
এখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তের খবর ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক সেকেন্ডের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছি। নতুনের প্রতি আগ্রহে তা সহজে গ্রহণ করছে অনেকে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ ধুম-ধাড়াক্কা গানের প্রতি অধিকমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছে। তাদের কাছে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লালনগীতি, দেশাত্মবোধক গান আকর্ষণ সৃষ্টি করে না। এসব বয়স্কদের গান। পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ তাই বয়স্কদের উত্সব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজি নববর্ষ তরুণদের উত্সব। একই বাংলায় বৃদ্ধ আর তরুণদের পছন্দ নিয়ে দু’ধরনের উত্সব নববর্ষের চেতনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। বছরের একটা দিনে শুধুমাত্র আমরা বাঙালি হবার চেষ্টা করি। বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে আর বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করি না। আমরা চলনে বলনে পাশ্চাত্য ভাবধারায় ডুবে যাই। এ অবস্থা আমাদের জন্যে ক্ষতিকর। বর্তমান প্রজন্ম যেভাবে চলছে তাতে পরবর্তী প্রজন্ম এ ধারা রপ্ত করলে পরের প্রজন্মও সে ধারা অনুসরণ করবে নিশ্চয়ই। ফলে আগামী বিশ বছর পর প্রবীণরা যখন বেঁচে থাকবেন না তখন বাংলা নববর্ষ কি পালিত হবে? সরকারিভাবে হয়তো দিনটি পালনের কর্মসূচি নেওয়া হবে। একেবারে যে কেউ ঐ অনুষ্ঠানে হাজির হবেন না তাও হয়তো ঘটবে না। কারণ চাকরি বাঁচাতে সরকারি কর্মকর্তা আর বিশেষ করে এনজিও যদি থাকে তাহলে লোকের কমতি হবে না। কিন্তু তাদের মন কতখানি থাকবে তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
কিন্তু এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় নির্ধারণে কেউ এখনো চিন্তা করছেন বলে মনে হয় না। তবে এখন থেকে চিন্তা এবং পরবর্তী উপায় নিয়ে চিন্তা শুরু করা উচিত। দেশের বৃহত্তম তরুণসমাজ যারা ইতোমধ্যে ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে পড়েছে তাদেরকে বাঙালি চেতনায় ফিরিয়ে আনতে এমন কিছু উপস্থাপন করা দরকার যাতে বাঙালি সংস্কৃতি থাকবে এবং তরুণসমাজের চাহিদা বজায় থাকবে। এ কাজে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যেমন এগিয়ে আসবে তেমন শহর ও গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সোচ্চার হতে হবে। ব্যান্ডের গান থাকবে, তার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বাংলার প্রাণ ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, দেশের গানও যাতে জনপ্রিয়তা না হারায় সেদিকে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি দেশপ্রেমিক নাগরিকসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশটা পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এখনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
অথচ ঘুড়ি যত ওপরেই উঠুক না কেন, লাটাই থাকে মাটির পৃথিবীতে তেমনি আমরা যারা যতই উপরে উঠি না কেন আমাদের মূল কিন্তু বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশকে যতই আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হোক না কেন ভুললে চলবে না যে, এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনো নিরক্ষর। শুধুমাত্র স্বাক্ষরজ্ঞান থাকলেই তাকে শিক্ষিত বলা যায় না। প্রতিটা দেশের কিছু নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার থাকে। সে কৃষ্টি-কালচার বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সকলের। কিন্তু সরকার তার দায় এড়াতে পারে না। বরং সরকারের দায়িত্ব আরো বেশি। গত ১৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বৈশ্বিক পরিসরে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে পরিচিত করার সুযোগ সবাই কাজে লাগাতে চায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান উলটো। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতের শিল্পী এ আর রহমানের পরিচালনায় ১৩০ সদস্য বিশিষ্ট সহশিল্পীদের নিয়ে যে কনসার্ট হয়ে গেলো সেখানে দেশীয় শিল্পীদের গুরুত্ব না দিয়ে হিন্দি ফিল্মি ছবির গানে মাতিয়ে রাখা হলো স্টেজকে। স্বাধীনতার মাস হওয়া সত্ত্বেও বাংলার পরিবর্তে হিন্দি গানের ধুম-ধাড়াক্কা অনুষ্ঠান আমাদের নববর্ষের মূল চেতনাকে অবমূল্যায়িত করেছে। একদিকে যেখানে বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখার ঘোষণা বার বার দেওয়া হচ্ছে সেখানে এ ধরনের অনুষ্ঠান মূল চেতনার পরিপন্থি। এ ব্যাপারে সরকার ও দেশপ্রেমিক জনগণের আরো সচেতন হওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, সরকার ও সচেতন মহল যদি বাংলা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে তবে মূল চেতনার পুনরুজ্জীবন ঘটবে না। অপসংস্কৃতি যা আমাদের ঐতিহ্যকে ম্লান করে দেয় তাই যখন এক শ্রেণির মানুষের কাছে অহংকার আর আভিজাত্যের পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায় তখনই প্রশ্ন জাগে আসলে আমরা এগুচ্ছি না পেছাচ্ছি? মিথ্যার ওপর সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ হোক আমাদের সংস্কৃতির মূল ধারক।
খুলনা
