আমাদের ক্ষমা করে দিও সাদ!

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৭
গত ১ এপ্রিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)-র চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সাদ তারই সহপাঠী বন্ধুদের হাতে নিহত হয়েছে। এই মেধাবী ছাত্রটির মৃত্যুর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ, উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও, প্রশাসন ভবন তালাবদ্ধ করা, প্রতিদিন মৌন মিছিল বা বিক্ষোভ মিছিল করা, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও শপথ নেওয়াসহ বিভিন্ন রকম কর্মসূচির মধ্য দিয়ে চলছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। তাদের দাবি—সাদ হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও বিচার। চলমান আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষকগণ। ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে বলা হয়েছে—যা যা করা দরকার সবই করা হবে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের শপথ বাক্যও পাঠ করিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা! তবে সাধারণ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকসমাজ তথা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কেউই প্রশাসনের এমন আশ্বাসের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না বা চাচ্ছেন না। কারণ নিকট অতীতে এমন আরো অনেক ঘটনাই ঘটেছে যেগুলোর বেলায়ও প্রশাসন এমনিভাবে আশ্বাস দেওয়ার নামে আন্দোলনকে প্রশমন করেছে বা ঘটনাকে অন্যভাবে উপস্থাপন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা আর দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। সরকার বদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর মাত্রা আর তীব্রতা শুধু বাড়েই। পরিণামে শুধুই নির্যাতন-নিপীড়ন! দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এখানেও আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। কেউ খুন হলে তার কোনো বিচার হয় না, শিক্ষক লাঞ্ছিত হলেও প্রশাসনের ভূমিকা হয় হতাশাজনক। একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে নিজের নামে বরাদ্দকৃত কক্ষে থাকতে হলে যোগ দিতে হয় কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলে, অন্যথায় ‘গণরুমে’ থাকতে হবে! কখনো শোনা যায় টাকার বিনিময়ে নাকি সিট পাওয়া যায়। প্রশাসন নাকি এসব জানে! তবে কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমনসব অপরাধীর আশ্রয়দাতা? তাদেরকে কি প্রতিহত করার কোনোই ব্যবস্থা নেই? হয়তো একদিন আন্দোলন থেমে যাবে। আমরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বো নিজেকে নিয়ে। ক্লাস-পরীক্ষা চলবে পুরোদমে। শুধু থাকবে না আমাদের সবার প্রিয় ‘সাদ’। আর যে মামলাগুলো করা হচ্ছে সাদের হত্যাকারীদের নামে কিছুদিন পর সেই মামলাগুলো কোনো না কোনো ভাবে উঠিয়ে নেওয়া হবে বা নিতে হবে (অতীতেও যা দেখেছি!) প্রশাসন থেকে দোষীদের যে শাস্তিটুকু বোর্ড অফ রেসিডেন্ট অ্যান্ড স্টুডেন্ট ডিসিপ্লিনের মিটিংয়ে (হয়তো) দেওয়া হবে তাও কিছুদিন পর ‘মানবিক কারণ’ দেখিয়ে উঠিয়ে নেওয়া হবে। খুনিদের কেউ কেউ হয়তো এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চাকরিও পেয়ে যাবেন (যা নিকট অতীতেও ঘটেছে)। এরই মধ্যে অনেকে সাদের এই হত্যার কারণটির কথা ভুলে যাবেন। বছরের একটি দিন হয়তো পালন করা হবে সাদের মৃত্যুবার্ষিকী হিসেবে। কিছুদিন পর সেটিও হবে না। একদিন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ভুলে যাবে তার নামটিও (কারণ এরই মধ্যে এমনি অন্য কোনো ঘটনা ঘটবে!) তাই সাদের কাছে, তাঁর বাবা-মায়ের কাছে আমাদের চিরজীবনই অপরাধী হয়েই থাকতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাড়া করে ফিরবে সাদের জন্য কিছু করতে না পারায়। তবুও সাদ, তোমাকে ভালবেসে যে তোমার সহপাঠী বন্ধু-শিক্ষার্থীরা বিচারটুকু চাইতে পেরেছে, সাধারণ শিক্ষকেরা নিজেদের অপরাধবোধটুকু প্রকাশের চেষ্টা করেছেন অন্তত এজন্য তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিও। ময়মনসিংহ