বছর ঘুরে বাংলার ঘরে আবারও বৈশাখ আসছে। আকাশে বাতাসে শোনা যাচ্ছে বৈশাখের আগমনী ধ্বনি। জীর্ণ-মলিন-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে গাওয়া হবে নতুনের আবাহনী সংগীত। কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হবে—
আজ আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও।
যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ-আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
সত্যিই জনমনে, প্রকৃতিতে বৈশাখের সে অন্যরকম এক ছোঁয়া। সর্বত্র অদ্ভুত এক সাড়া।
তবে পয়লা বৈশাখ এখন আর কেবল আমাদের শুভ নববর্ষই নয়। এটা এখন ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রধান উত্সবও বটে। এই দিনে নতুনকে বরণ করতে মাতে পুরো বাংলাদেশ। কী গ্রাম, কী শহর—সর্বত্র একই দৃশ্য। নির্মল আনন্দের অবকাশহীন এই দেশে পয়লা বৈশাখ যেন সব গুমোট ও আবডাল ভেঙে প্রাণের উচ্ছ্বাসের দিন। এই দিনে একই আনন্দে প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে একাকার হয় দেশের মানুষ। পথ-ঘাট, মাঠ-মঞ্চ—সবকিছু ভরে ওঠে উত্সাহ-উদ্দীপনায়।
কৃষিভিত্তিক এই বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনটিকে উত্সবের আমেজে বরণের প্রথা এক সময় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কেবল সীমিত ছিল। সময়ের আবর্তনে সে আমেজ এখন সর্বত্র। গ্রামের চেয়ে বরং শহরেই যেন তা বেশি। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ কেবল শৌখিন সংস্কৃতিচর্চা নয়, ব্যবহারিক নববর্ষও। আমাদের কৃষকেরা আজও বীজ বোনেন, চারা রোপণ করেন, ফসল কাটেন বাংলা পঞ্জিকা ধরে। আমাদের ব্যবসায়ীরা এই দিনটিতে বহু বছর ধরেই হালখাতা খুলে আসছেন। কেবল বাঙালির নয়, পয়লা বৈশাখ আমাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোরও উত্সবের দিন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এই দিনেই মেতে ওঠে বৈসাবি বা বিঝু উত্সবে। চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা, পয়লা বৈশাখের মেলা, বারুণীর মেলা, চড়কের মেলা—কত্ত যে মেলা এই পহেলা বৈশাখ ঘিরে। মেলায় বসে বিচিত্র দেশি সৃষ্টিশীল পণ্যের পসরা। কৃষকেরা বসেন তাঁদের কৃষিপণ্য নিয়ে। বসে পালাগান বা যাত্রাগানের আসর। সেসব ঘিরে জাগে নিস্পন্দ গ্রাম-জীবন। জাগে কৃষক, কামার-কুমোর, বেতশিল্পী, বাঁশশিল্পী, নানা কারিগরের নিস্তরঙ্গ ও একঘেয়ে জীবন। বলতে গেলে গোটা বছর তারা এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকে। এইসব মেলা ও উত্সবের কারণে দেশীয় পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যরুচির মর্যাদা বেড়েছে। আমাদের বাঙালিয়ানায় যোগ হয়েছে নতুন বেগ ও আবেগ। এই উত্সবে ঘটে মানুষে মানুষে মিলন ও সৌহার্দ্যের নবায়ন। দিনভর শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। মাটির হাঁড়ি আর বাঁশের পাত্রে বিনিময় হয় মিষ্টান্ন, পিঠাপুলিসহ বিচিত্র ঐতিহ্যবাহী খাবার। মানুষে মানুষে এমন মিলন, এমন সৌহার্দ্যময় পরিবেশ কেবল পয়লা বৈশাখের মতো অসাম্প্রদায়িক উত্সবেই দেখা যায়।
বাংলা নববর্ষের মতো ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন উত্সব বিশ্বে বিরল। বিশ্বে প্রচলিত প্রধান প্রধান বর্ষপঞ্জির উত্পত্তি ধর্মের সঙ্গে জড়িত। সেখানে সম্রাট আকবরের চালু করা বাংলা নববর্ষের যোগ যেন জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে। আদিতে বাংলা নববর্ষ প্রচলন কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের নিমিত্ত হলেও ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় বাঙালির জাতীয় উত্সবে। বাঙালির আদি পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উত্সবটি ষাটের দশকে বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকেও বেগবান করে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে জোগায় বিপুল প্রেরণা। এই সর্বজনীন উত্সবে কলঙ্কের দাগ বলতে একটাই রমনা বটমূলে ১৪০৮ সালে নববর্ষ উদযাপনের সময় মর্মান্তিক ও বর্বর বোমা হামলা। দুর্ভাগ্য, ঘটনার ১৩ বছর পরেও দুষ্কৃতিকারীদের এখনো সাজা দেওয়া যায়নি। নববর্ষ মানে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংকল্প। নববর্ষে আমাদের প্রত্যাশা—গত বছরের সমস্ত আবর্জনা দূর হয়ে যাক। দুর্বৃত্তায়ন ও অপশাসনের রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিপাত যাক। ইতিহাস নিয়ে অহেতুক কুতর্ক বন্ধ হোক। রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনা ও চর্চা প্রতিষ্ঠা পাক। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি ও সাফল্য আসুক । জন নিরাপত্তা, স্বস্তি- শান্তি নিশ্চিত হোক। মুক্তি পাক মানবতা, মানবাত্মা।
ঢাকা
