অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধির অঙ্গীকার করে ডিসিসি বিভক্ত করা হলেও কার্যত কিছুই হয়নি। বরং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় কোনো জবাবদিহিতা নেই এ দু’টি প্রতিষ্ঠানে। দুই সিটি কর্পোরেশনে দুইজন মেয়রসহ ১২৬ জন জনপ্রতিনিধির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মাত্র ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও ২ জন প্রশাসক। দুই সিটি গঠনের ২৮ মাস পরও নানা জটিলতায় এখনও সেগুলোতে নির্বাচন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রশাসক অদল-বদল করে পরিচালিত হচ্ছে দুই সিটি। স্থানীয় সরকারের এ দুই প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন কবে হবে—তার স্পষ্ট জবাব দিতে পারছে না কমিশনও।
জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, সীমানা জটিলতার বিষয়টি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) ২০০৯ সালের আইন সংশোধন করে ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশন করা হয়। ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ৯৩টি ওয়ার্ডে রয়েছে ৯৩টি ওয়ার্ড সেবা কার্যালয়। এসব অফিস থেকে নগরবাসী বিভিন্ন ধরনের সনদ, সুপারিশ, পাসপোর্ট সত্যায়ন, স্বাক্ষর বা টিপসই/ছবি সত্যায়ন, বিবিধ সনদ সুপারিশ বা সত্যায়ন, জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরম সত্যায়ন, সালিশি মীমাংসা, বিভিন্ন গাড়ি স্থানান্তরের প্রত্যয়নসহ নিজস্ব এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এসব অফিসের একেকটি চালাতেন একজন কাউন্সিলর। আর এখন কার্যত অফিসগুলো খালি পড়ে আছে। একজন অফিস সহকারী থাকলেও (ওয়ার্ড সচিব) তিনি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ২৫-১( খ) ধারায় প্রশাসকের মেয়াদ প্রথমে ৯০ দিন করা হয় পরে আইনে আবার সংশোধনী এনে তা ১৮০ দিন করা হয়। এভাবেই গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রশাসক অদল-বদল করে চলছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। অথচ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের (১) তে বলা আছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনভার প্রদান করা হবে’। এছাড়াও স্থানীয় সংস্থার প্রতিটি স্তরে জনপ্রতিনিধির দ্বারা পরিচালিত হবার উচ্চ আদালতের নির্দেশ রয়েছে। বাস্তবে দুই সিটির ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র বিরাজমান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছে জনসেবা কার্যক্রম। পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জনসাধারণ। নগর সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
সড়ক সংস্কার, আবর্জনা পরিষ্কার, সড়কবাতি সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা ডিসিসির প্রধান কাজ। এর বাইরে ডিসিসি সেবামূলক আরও অনেক কাজ করে থাকে। কিন্তু বর্তমানে ডিসিসি নাগরিকদের জন্য মৌলিক সেবাগুলো নিশ্চিত করতে পারছে না। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে যা হয়েছে তা সুশাসন এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে নয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে ঠিক ঠিক আইন মেনেই এবং যথাসময়ে। একটি বড় রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচন থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার পরও দশম সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতিমধ্যে পঞ্চম ধাপে ৪৫৮টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনও সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বর্জনকারী রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ তাদের সমর্থনকারী রাজনৈতিক দল সকলেই অংশ নিয়েছে এ নির্বাচনে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন কবে হবে সে প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছাই জরুরি। সরকারকে নির্বাচন আয়োজনে এগিয়ে আসতে হবে।
যে কারণে আটকে আছে নির্বাচন
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১২ সালে কোটি মানুষের এই দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও আইনি জটিলতায় তা আটকে যায়। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০১২ সালের ২৪ মে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। ২০১৩ সালের ১৩ মে নির্বাচনের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে নতুন করে তফসিল ঘোষণার উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একটি নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় সীমানা জটিলতায় নির্বাচন আবারো ঝুলে যায়। সীমানা নিয়ে জটিলতা নিরসনে এরপর স্থানীয় সরকারের পরামর্শ চায় তারা। কমিশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চিঠিও দেয়। কিন্তু তাতেও ইতিবাচক সাড়া পায়নি ইসি। সিইসি ইতোমধ্যে বলেছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ সীমানা পুনর্নির্ধারণ সম্পন্ন করলেই ভোটে উদ্যোগী হবেন তারা।
জটিলতা নাকি অন্যকিছু
আদালতে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৩ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঢাকার ডিসিকে প্রধান সীমানা নির্ধারণ কর্মকর্তা ও উপ-পরিচালক স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) সহকারী সীমানা নির্ধারণ কর্মকর্তা নিয়োগ করে। গত জানুয়ারি মাসে বিরোধ নিষ্পত্তি করে এ সংক্রান্ত নথি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠনো হয়। নিয়ম অনুযায়ী এটি আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু গত প্রায় দুই মাস চলে গেলেও সে কাজটি হয়নি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও বনশ্রী আবাসিক এলাকা নতুন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সীমানা নির্ধারণ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ফেব্রুয়ারি মাসেই পাঠানো হয়েছিল আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। এ বিষয়ে মতামত দিয়ে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর কথা থাকলেও কমিশন এখনও তা পায়নি।
ঢাকা সিটিতে মাত্র দু’বার নির্বাচন
১৯৯৪ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট চালু হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটে নির্বাচন হয়েছে চারবার। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হয়েছে মাত্র দু’বার। এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে প্রথম নির্বাচনের পর দ্বিতীয় নির্বাচন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে মেয়াদ শেষ হলেও নির্বাচন হয় আরও তিন বছর পর ২০০২ সালে। তখন ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ঢাকা সিটি করপোরেশনে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০০২ সালে। ওই ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা। ২০০৭ সালে তার মেয়াদ শেষ হয়।
