বন্ড সুবিধায় বিনা শুল্কে পূর্বে আনা পণ্য সামগ্রীর কোনো সঠিক তথ্য দিতে না পারায় প্রায় প্রতিদিন চট্টগ্রাম কাস্টমস চালান আটক করছে। বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য দিয়ে মালামাল তৈরি করে রফতানির নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না। বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্য উত্পাদনের জন্য নিট ও ওভেন কাপড় কাঁচামাল হিসেবে আনা হলেও অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান তা খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে।
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক হাজার বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থাকলেও শুল্ক সুবিধায় তারা কাঁচামাল হিসেবে পণ্য আমদানি করে পরিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে ফিনিস্ড সামগ্রী তৈরি করে রফতানি করছে কিনা তা তদারকি হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। বন্ড কমিশনারেট অফিসের মাধ্যমে তদারকি হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
আবার বন্ড কমিশনারেট অফিসের পক্ষ থেকে সকল বন্ড প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক তদারকি সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান। ফলে অসাধু বন্ডেড প্রতিষ্ঠান তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ডের অনিয়মের বিষয়টি দেখার মূল দায়িত্ব বন্ড কমিশনারেট অফিসের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে কিছু কিছু বন্ড প্রতিষ্ঠানের আমদানির ব্যাপারে সন্দেহ হলে তা সংশ্লিষ্ট বন্ড কমিশনারেট অফিসকে অবহিত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে যাচাই করে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অনেক বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ তাদের লাইসেন্সে বিনা শুল্কে পণ্য আমদানি হচ্ছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এক কেজি পণ্যও রফতানি করেনি। কিন্তু কয়েক হাজার টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। কেউ কেউ কয়েকশত কেজি পণ্য রফতানি করলেও কয়েক হাজার টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। বন্ডের প্রাপ্যতা ও তার স্টক করার নির্দিষ্ট সীমার কয়েকশত গুণ বেশি পণ্য আমদানি করেছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমদানি পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে পরিমাণ কাপড় আমদানি করেছে তার সমপরিমাণ কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে বেশি পণ্য রফতানি করেছে। এক্ষেত্রে পরিমাণগত হিসেব ঠিক থাকলেও টাকার পরিমাণে অনেক কম পাওয়া যায়। কারণ সে যে মূল্যের কাপড় বিনা শুল্কে এনেছে, রফতানির ক্ষেত্রে অনেক কম মূল্যের কাপড় দিয়ে পণ্য তৈরি করে রফতানি করেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অনেক অভিনব কায়দায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে।
গত কয়েক বছর ধরে জালিয়াতির পর গত মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস তা উদ্ঘাটন করে। চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গত প্রায় তিন মাসে সন্দেহজনক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ইতিপূর্বেকার কাঁচামাল আমদানির তথ্য যাচাই করে অনিয়ম দেখতে পায়।
এর মধ্যে ঢাকার টঙ্গী এলাকার জায়ান্ট গার্মেন্টস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ গত এক বছর চার মাসে ৮০৩ টন পণ্য আমদানি করলেও দেখা যায় তার বিপরীতে কোনো রফতানি নেই। গাজীপুরের নাসরিন জাহান নিটওয়্যার প্রায় দেড় বছরে ৩ হাজার ৫৪৬ টন পণ্য আমদানি করলেও রফতানি করছে মাত্র ৫৫১ টন পণ্য। চট্টগ্রামের হালিশহরের ফোকাস এ্যাপারেলস আমদানি করেছে ৩৬৭ টন, রফতানি করেছে মাত্র ১০৭ টন। নারায়ণগঞ্জের অনন্ত ডেনিমের আমদানি ১০ হাজার ৩৪১ টন, অথচ তার বিপরীতে রফতানি ৪ হাজার ৭৬৩ টন। তার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একসাথে পণ্য রাখার ক্ষমতা মাত্র ২৬০ টন। এ.আর.কে এমপ্রেক্স এর আমদানি ৬৯১ টন। কিন্তু এর বিপরীতে গত প্রায় দেড় বছরে কোনো রফতানি নেই। ঢাকার রুমানা নিট ওয়্যারের আমদানি ২ হাজার ৮৮১ টন। কিন্তু রফতানি মাত্র ৯৫২ কেজি।
কাস্টমসের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এর পক্ষ থেকে যে ব্যবহার ছাড়পত্র (ইউডি) দেওয়া হয় তাতেও সমস্যা দেখা যায়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে বন্ডেড সুবিধায় আসা পণ্যের যে সকল চালান আটক করা হয়েছে তার একটি তালিকা শিগগিরই বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-কে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, কাস্টমসের কোনো পণ্য সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট বন্ড কমিশনারেটকে জানানোর পর তা যাচাই করে আটক করা হয়।
ঢাকা বন্ড কমিশনারেট হুমায়ুন কবির জানান, চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা ও আমদানির সাথে রফতানির পার্থক্য দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের স্টক যাচাইয়ের প্রেক্ষিতে আর্থিক ডিমান্ড, জরিমানা এবং লাইসেন্স বাতিলের কার্যক্রম চলছে। তিনি জানান, ২০১৯ সালে ১২৬টি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১১০টি লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। শুধু মে মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত আরো ১৬টি লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট থেকে প্রায় ৩০টি বন্ড লাইসেন্স স্থগিত ও শো-কজ করা হয়েছে বলে জানা যায়। ঢাকা বন্ড কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার আল আমিন জানান, অস্তিত্বহীন বন্ড প্রতিষ্ঠান এবং আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়গুলো দেখে প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
