নেশায় জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:৩৪
নেশায় জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। রাজধানীর নামী স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশুটিও ঝুঁকছে মাদকে। নতুন ক্রেতা পেতে সুপরিকল্পিতভাবে জাল পাতছে মাদক ব্যবসায়ীরা। আর মাদকের সেই জালে সবার আগে আটকে যাচ্ছে শিশু-কিশোররাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন ও সচেতনতাই পারে মাদকের হাত থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে। রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনের পাশের একটি ফুটপাতে কথা হয় তানিয়ার সঙ্গে। তার বয়স তের কি চৌদ্দ। পরনের কাপড়-চোপড় ময়লা, দুর্গন্ধময়। চোখ ঢুলুঢুলু। জানতে চাইলাম মাদক নিয়েছ কেন? জড়ানো কণ্ঠে বললো, জানি না। নেশা কর কয়দিন? জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ‘অনেকদিন হইবো, এখন মন নাই। তয়, ট্রেনে এক ব্যাডা খাওয়াইছিল।’ পাশেই ঘিরে থাকা তার সঙ্গীদের একজন বলে, ‘যে ব্যাডা খাওয়াইছে হ্যায় ওগুলির (মাদকের) ব্যবসা করে।’ তানিয়াকে এখন প্রতিদিন কোন না কোন মাদক গ্রহণ করতেই হয়। তবে তানিয়ার হাতে ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য কাটার দগদগে ঘাঁ। এসব কিভাবে হয়েছে জানতে চাইলে তানিয়ে বলে, ‘নিজেই করেছি...!’ রাজধানীর কারওয়ানবাজারে রেল লাইনের পাশে পলিথিন ব্যাগে মুখ ডুবিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল বার-তের বছরের কয়েকজন। ওটাই ড্যান্ডি। চামড়া জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহূত একধরনের আঠা। কিছুক্ষণ পর বড় একটি সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রেল লাইন ধরে হাঁটতে শুরু করেছে শাকিল। জিজ্ঞেস করি, কি খাচ্ছিলে? শাকিলের খুব সাবলিল উত্তর—‘ড্যান্ডি খাই; ভালা লাগে খাইতে।’ ড্যান্ডি কিনতে কত টাকা লাগে? উত্তর আসে—‘একেক সময় একেক দাম দিয়া কিনি। কখনো ২০ ট্যাকা, কখনো ৩০ ট্যাকা, কখনো ৫০ ট্যাকা, ঠিক নাই...’। বাংলাদেশে শিশু-কিশোর মাদকসেবী কত এর কোন হিসাব নেই সরকারের কাছে। এমনকি সারাদেশে কতজন মাদকাসক্ত তাও জানে না সরকার। তবে আইসিডিডিআরবি ও বেসরকারি সংস্থা মোস্ট অ্যাট রিস্ক অ্যাডোলেসেন্ট (এমএআরএ) এর ২০১২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪ লাখ ৪৫ হাজার পথশিশু রয়েছে। কেবল রাজধানীতেই আছে ৩ লাখেরও বেশি পথশিশু। এসব পথশিশুর মধ্যে বেশিরভাগই মাদকাসক্ত এবং এদের সংস্পর্শে এসে প্রতিদিনই নতুন করে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’ এর তথ্য মতে, শতকরা ৮৫ ভাগ পথশিশুই কোন না কোন মাদক গ্রহণ করে। রাজধানীর কারওয়ানবাজার, কমলাপুর রেল স্টেশন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম চত্বর, চাঁনখারপুল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, সায়েদাবাদ, গাবতলী বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্থানে খুব সহজেই দেখা মেলে মাদকাসক্ত এসব পথশিশুর। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে এরকম কমপক্ষে ২২৯টি স্পটে শিশু-কিশোররা মাদক সেবন করে। তারা সাধারণত গাঁজা, হেরোইন, ঘুমের ওষুধ, ড্যান্ডি বেশি গ্রহণ করে। মাদকাসক্ত এসব শিশুর বেশিরভাগই কোন না কোন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কখনো নেশার টাকা যোগাতে। কখনো মাদক ব্যবসায়ীদের ইশারায় মাদকদ্রব্য বহন করে। অপরাধ কী বোঝার আগেই তারা ভয়াবহ অপরাধী হয়ে বেড়ে উঠছে। নিজের মাদকের টাকা যোগাতে যুক্ত হচ্ছে বড় অপরাধ চক্রের সঙ্গে। আর কিশোরীরা জড়িয়ে পড়ছে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৪৪ ভাগ পথশিশু মাদক গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। ৩৫ শতাংশ পথশিশু পিকেটিংয়ে সঙ্গে, বোমাবাজির সঙ্গে জড়িত ১৬ ভাগ পথশিশু, ১২ শতাংশ হাইজ্যাকের সঙ্গে, আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসীদের সোর্স হিসেবে পাঁচ শতাংশ ও অন্যান্য অপরাধে সঙ্গে শতকরা ২১ ভাগ পথশিশু জড়িত। পথশিশুদের মাদক সেবনের দৃশ্য হরহামেশা চোখে পড়লেও উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু-কিশোরদের মাদকসেবনের এই দৃশ্য চোখে পড়ে না। যেটা দেখা যায় তাহল ধূমপান। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের আশপাশের চায়ের স্টল ও রেস্টুরেন্টে কিশোর-কিশোরীদের ধূমপান করতে দেখা যায়। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর আশপাশে চোখ রাখলে এ দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। আবিদুর রহমান (ছদ্মনাম) একটি নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের ‘পানসি রেস্টুরেন্ট’ সংলগ্ন লেকের পাশে কথা হয় তার সঙ্গে। সিগারেটের পাশাপাশি এখন ফেনসিডিল ও মাঝেমধ্যে ইয়াবা সেবন করে বলে জানায়। কবে থেকে মাদক নেয়া শুরু করেছে জানতে চাইলে বলেন, ‘বন্ধুদের আড্ডায় সিগারেটের সঙ্গে গাঁজা সেবনের মধ্য দিয়ে মাদক নেয়া শুরু করি।’ রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব কিশোর-কিশোরীরা মাদকাসক্ত কিংবা ধূমপান করছে, তাদের খোঁজ নিলে জানা যায়—সেসব ছেলে-মেয়েদের পরিবারে বিভিন্ন অসংগতি রয়েছে। যেমন বাসায় হয়তো বাবা-মা সময় দেন না, ভেঙ্গে যাওয়া পরিবার, বাবা-মায়ের মধ্যে ভালো সম্পর্ক নেই, ছেলে-মেয়েদের হাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে রাখা, বাড়তি টাকার হিসেব অভিভাবকদের না রাখা। এসব কারণে মাদকের দিকে শিশু-কিশোররা ঝুঁকছে বেশি। তারা জানে না মাদকের এসব ভয়াবহ পরিণতি। মনোবিজ্ঞানী ডা. মুহিত কামাল বলেন, শিশু-কিশোররা নানাভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বস্তির শিশুরা একভাবে মাদকাসক্ত হচ্ছে আবার পথশিশুরা অন্যভাবে মাদকাসক্ত হচ্ছে। কেউ অফার করলে তাকে ‘না’ বলার অভ্যাস করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে জাল ফেলছে সমাজে। একটি ইংরেজি মাধ্যমের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে জিরো ফিগারের প্রলোভন দেখিয়ে এক বোতল ট্যাবলেট দেয় এক মাদক ব্যবসায়ী। এই ট্যাবলেট সেবনের পরেই সে আসক্ত হয়ে পড়ে; এরপর খুঁজতে থাকে সেই ট্যাবলেট...! মেয়েটি জানে না এটা মাদক! শিশু-কিশোরদের সচেতন করতে হবে। সেটা হতে হবে পরিবার থেকে। সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, এসব শিশু-কিশোরদের সামাজিকীকরণ হচ্ছে না। যার কারণে তারা সুনাগরিক হিসেবেও গড়ে উঠছে না। এদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা প্রবল থাকে। এরা সহজেই অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। যদিও এসব শিশু-কিশোরদের সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই; তবুও এদের সংখ্যা ১০ ভাগ হলেও এরা সমাজের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। সুষ্ঠু সমাজ গড়তে এসব শিশু-কিশোর বড় ধরনে হুমকি বলে জানান তিনি। মাদকাসক্ত শিশু-কিশোরদের চিকিত্সায় নেই পর্যাপ্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি চিকিত্সা ব্যবস্থা। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে সারাদেশে মাত্র চারটি। এই চারটির শয্যা সংখ্যা মোট মাত্র ৫৫টি। এর মধ্যে সারাদেশে শিশুদের জন্য শয্যা রয়েছে কেবল ঢাকাতে মাত্র ১০টি। ঢাকা মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের আসন সংখ্যা ৪০টি, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী এই তিনটিতে ৫টি করে শয্যা রয়েছে। কেন্দ্রীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমীর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, দেশের মাদকাসক্তদের সঠিক কোন সংখ্যা এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত দেশে সরকারিভাবে কোন জরিপ বা সার্ভে করা হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মাদকাসক্তরা এ বিষয়ে কথা বলতে চান না কিংবা অভিভাবকরাও বিষয়টি চেপে যান। তবে, বিষয়টি নিয়ে তারা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান। তিনি বলেন, দেশের মাদকাসক্তের সংখ্যা অনুপাতে চিকিত্সা কেন্দ্র অনেক কম। তারপরও মাদকাসক্তদের চিকিত্সা কেন্দ্রে আসার প্রবণতা একেবারেই কম। এজন্য পরিবারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।