রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় জেলা পরিষদগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক দলের কর্মীদের আড্ডাখানায় পরিণত হওয়া জেলা পরিষদগুলো কার্যকর করতে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে পরিষদ গঠনের সুপারিশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে জেলা পরিষদের কাজে সংসদ সদস্যদের প্রভাব ও অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসকের কাজের সুষম বণ্টনেরও আহ্বান জানিয়েছে দুর্নীতি বিরোধী সংগঠনটি।
গতকাল বুধবার ‘স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জেলা পরিষদ:সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক টিআইবি পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে নয় দফা সুপারিশ করা হয়েছে। রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক রফিকুল হাসান। মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাহিদ শারমীন।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী ও কার্যকর ছিল। কিন্তু এখন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাবের কারণে তা অনেকটাই দুর্বল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন সঠিকভাবে হয়নি। তবে নির্বাচন বন্ধ রাখা যাবে না। এর প্রতিবাদ করতে হবে। তিনি বলেন, উপজেলায়ও সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ করার ক্ষমতা দিতে হবে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেললে চলবে না। নির্বাচন বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকার হবে সেটা চাই না। নির্বাচন খারাপ হয়েছে। আরো ভাল নির্বাচন করতে হবে। আমরা মনে করেছিলাম, অনিয়ম ও সহিংসতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পার করে এসেছি। কিন্তু এখন দেখছি তা আবার ফিরে আসছে। নির্বাচন করতে হবে, প্রতিবাদও করতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেতনার অভাব থাকায় স্থানীয় সরকার কার্যকর হচ্ছে না। জেলা পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসকের কাজের সুষম বণ্টন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের প্রভাব কমাতে হবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে জেলা পরিষদের কার্যকারিতা দুটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর টানাপোড়েনের শিকার হয়ে পড়েছে। একদিকে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রবণতা অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের কাছে জনগণের অংশীদারিত্ব মেনে নেয়ার মানসিকতার ঘাটতি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অনির্বাচিত ও দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে নিয়োগ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব ও সরকারি কর্মকর্তাদের অনীহার কারণে জেলা পরিষদ কেন্দ্রীয় সরকারের একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োজিত প্রশাসনের অধীনে দুর্নীতি, অনিয়ম, ব্যক্তিগত কাজে জেলা পরিষদের তহবিল ব্যবহারসহ দলীয় নেতাকর্মীদের দৈনিক ভিত্তিতে আপ্যায়নের দৃষ্টান্তও রয়েছে।
অথচ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জেলা পরিষদকে শক্তিশালীকরণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। ২০০০ সালে জেলা পরিষদ আইন প্রণীত হলেও বিগত ১৪ বছরেও জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। তাই জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে শূন্য পদ পূরণ, স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে মাসিক সভা, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, জেলা পরিষদ প্রশাসক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সার্বিক ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধনের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
