বছরের প্রথম দিনটিতে বিশ্বের সব প্রান্তের বাঙালিরা অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। নতুন বছরটি যেন সুন্দর, সুখময় ও সমৃদ্ধ হয় এই কামনাই সবার থাকে। আর উত্সব মানেই তারুণ্যের জোয়ার। আর তাই সববারের মতো এবারও এই সার্বজনীন উত্সবটি তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠবে। ইতোমধ্যে তরুণদের মধ্যে এ নিয়ে প্রস্তুতিও বেশ জোরেশোরেই চলছে। দিনটি ঘিরে তরুণদের নানা আয়োজন নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
‘এসো এসো এসো হে নবীন, এসো এসো হে বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কাল বৈশাখীর ডাক।’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের তারুণ্যের প্রতি এই আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরও বেশি তরুণ। প্রতি বছরেই বৈশাখ আসে নতুন রূপে নতুন সুরে নতুনের আহ্বানে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নি স্নানে সূচী হোক ধরা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো’—জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। বছরের সারাটা সময়ে তরুণরা এর আয়োজনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকে। আবার অনেকে বৈশাখ আসার পূর্বেই বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে রাখে বৈশাখের দিনটা কীভাবে কাটাবে ভেবে। যেমন—স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ’র ছাত্র রিফাতের কাছে বৈশাখের প্রথম দিনটা সবসময়ই অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা হয়ে থাকে। এই দিনটাকে নিয়ে সবসময়ই থাকে তার আলাদা পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা সবার আগে প্রাধান্য পায়। আর অবশ্যই এর সাথে যোগ হবে দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি। তবে খাওয়া-দাওয়ার তালিকাটা গোপন রাখাই ভালো! একই ডিপার্মেন্টের মিলির বৈশাখের প্রথম দিনটা আর সবার মতোই কাটে। দারুণ আনন্দ নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়েন। লক্ষ্য রমনার বটমূল। তারপর রমনাতে গিয়ে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা তো এখন একটা রেওয়াজ। সুতরাং তার পান্তা ইলিশ চাই-ই চাই। আর মেলায় ঘোরাঘুরি ছাড়া পহেলা বৈশাখ জমেই না। তাই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে বৈশাখ উপভোগ করেন মিলি। ওদিকে তেজগাঁও কলেজের অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়ুয়া রিমার সবসময় আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না। তাই এই দিনটাকে সে বেড়ানোর কাজে ব্যবহার করে থাকে। বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে মোটামুটি কাছের সব আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অল্প সময়ের একটি দুদান্ত ট্যুর প্ল্যান করে সে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির মিতু থাকে ইউনিভার্সিটি হলে। তাই সবসময় বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না তার। বৈশাখের এই দিনগুলোতে ছুটি পায় বলে বাসায় চলে যান। ওখানে এই দিনটাতে সকালবেলা সর্বপ্রথম বাবা-মায়ের কাছে যান। এরপর নাস্তা সেরে সব স্কুল বান্ধবীদের সাথে দেখা করেন। সবাই এই দিনটাতে নতুন করে আড্ডায় মেতে উঠেন। তারপর সবচেয়ে প্রিয় আম ভর্তা তৈরি করে সবাই মিলে একসাথে খান। সব মিলিয়ে এই দিনটা তরুণরা ব্যাপক হৈচৈ করেই কাটিয়ে দেয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের প্রথম খবর ১৯১৭ সালে পাওয়া যায়। তখন প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপর ১৯৩৮ সালেও একই কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এর পুনঃজাগরণ ঘটায়। এভাবেই বাঙালির আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের শুরু হয়। নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে। শহুরে জীবনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন নববর্ষ অপূর্ণ থেকে যায়। ঢাকার রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমেই বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি গেয়ে নতুন বর্ষকে বরণ করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট এই রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। ঢাকার বৈশাখী বা নববর্ষ উত্সবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে এখানেই শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় আবহমান গ্রামবাংলা ও জীবনের ছবিকে ফুটিয়ে তোলা হয়। তরুণরা এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন রং-বেরঙের মুখোশ পরে। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এই দিনটি আরও উত্সবমুখর হয়ে ওঠে। ঢাকার রমনা বটমূল এই উত্সবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়। ১৯৮৩ সালে রমনা বটমূলে কয়েকজন বাংলা সংস্কৃতি প্রিয় মানুষ প্রথম পান্তা-ইলিশের সূচনা করেন। তখন পান্তা-ইলিশের সাথে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে এর আয়োজন করা হয়। এভাবেই রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশের সূচনা হয়, যা আমাদের বাঙালিয়ানার পরিচয় বহন করে। আর এখন তো এ পান্তা-ইলিশ ছাড়া নববর্ষ চিন্তাই করা যায় না। বৈশাখ মানেই যেন মেলা। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় মেলা শুরু হয়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় এই বৈশাখী মেলা মাসব্যাপী হয়। এই মেলাতে নানা প্রকারের দেশীয় মিষ্টান্ন, নারিকেল মুড়কিসহ আরও অনেক সুস্বাদু খাবারের দেখা মেলে। প্রতি বছর বাংলাদেশের চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দানে বসে ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাঠি খেলা, নৌকাবাইচ প্রভৃতি খেলা হয়। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছরই মোবাইল কোম্পানিগুলো নিয়ে আসে তরুণদের জন্য তাদের হরেক রকম অফার। আর এ অফারগুলোর সঙ্গে নানা রকম উপহার সামগ্রী তো রয়েছেই। কী গ্রাম কী শহর সর্বত্রই সৃষ্টি হয় অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য। আনন্দে মাতে পুরো দেশের তারুণ্য। পহেলা বৈশাখের বেশ কিছু দিন বাকি থাকতেই শুরু হয় এর প্রস্তুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও তরুণদের দিনটি হোক লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। ভোরের আলো ফুটতেই তরুণদের সাজসজ্জা শুরু হয়। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকবেই, সঙ্গে থাকতে হবে অন্যান্য রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা সবাই লাল পরবেন। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো এবার কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকছেন অধিকাংশ ফ্যাশনসচেতন তারুন্য। শুধু এই দিনটিতে নয়; বরং প্রাণের টানে আর নিজের ঐতিহ্যের গর্বে নিজস্ব চেতনায় আপনি বাঙালিয়ানাকে ছড়িয়ে দিতে পারেন আপন ঐশ্বর্যে।
মডেল আসীম ও সাদিকা
