ক্রিকেট খেলা ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। সেই চর্চাই তাকে করেছে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সী নতুন ও সম্ভাবনাময় একজন পেসার পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই নতুন মুখ তাসকীন আহমেদ তাজিন। তাকে নিয়ে লিখছেন আহসান রনি ও ছবি তুলেছেন ফারহান ফয়সাল
খেলাধুলার প্রতি তার ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকেই বেশি। খুব আগের ঘটনা নয়। তিনি তখন ১২ বছরের কিশোর। কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন ক্রিকেটের ভূত। সারাদিন ক্রিকেট খেলে বেড়ান। একদিন দুপুরে রোদে পুড়ে ক্রিকেট খেললেন। বাবা জানতে পেরে পিটুনি দিলেন তাকে। কিন্তু পিটুনি খেয়ে কি ক্রিকেটের ভূত নামে! তিনদিন পর বন্ধু কাইয়ুম এসে জানালো, ডিসকভারি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে অনূর্ধ্ব ১২-এ খেলার জন্য নতুনদের ট্রায়াল নেওয়া হচ্ছে। তিনি দোটানায় পড়ে গেলেন বাবার কথা ভেবে। আবার যদি পিটুনি খেতে হয়। একসময় বাবার ভালো মুড দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে জানালেন নিজের ইচ্ছার কথা। বাবা মানা করলেন না। কোচ শাহজাহান উল্লাহ সাজু তার বোলিং দেখে বেশ প্রশংসা করলেন। একদিন বাবাও গেলেন ছেলের প্র্যাকটিস দেখতে। সবার কাছে ছেলে খেলার প্রশংসা শুনে সেখানেই ভর্তি করে দিলেন তাকে। তবু মাঝে মাঝে ছেলেকে খুব ক্লান্ত দেখে মানা করতেন প্র্যাকটিসে যেতে। কিন্তু কার কথা কে শোনে। সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে প্র্যাকটিসে চলে যেতেন তিনি। অনূর্ধ্ব ১২, বুস্ট পাওয়ার কাপের কিছু কিছু ম্যাচে ভালো খেলে নজর কাড়তে থাকেন সবার। ছোট থেকেই তার স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলার। কীভাবে খেলা যাবে, কী কী করতে হবে—কোনোদিকে তার কোনো খেয়াল থাকত না। তিনি শুধু প্র্যাকটিস করে যেতেন। মনে করতেন ভালোভাবে প্র্যাকটিস করাই জাতীয় দলে খেলার প্রধান শর্ত। অনূর্ধ্ব ১৫, ভারতের প্রাদেশীয় টিমসহ বিভিন্ন খেলায় ফাস্ট বল করে নজর কাড়েন সবার। তবে ব্যাটিংয়েও কম ঝলক দেখাননি। পেস বোলিং ফাউন্ডেশনের পরীক্ষায় ৬০০ জনের মধ্য থেকে সেরা ২০ জনের মধ্যে চলে আসেন তিনি। ২০১০ সালে ফার্স্ট ডিভিশন ও অনূর্ধ্ব ১৭-এ খেলেন তিনি। তার বলের জোর দিয়ে ব্যাটসম্যানদের চোখে সর্ষে ফুল দেখাতে থাকেন। কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন তার বল দেখে বলেই ফেলেন, বাহ! ছেলেটার বলে তো ভালোই জোর। প্রিমিয়ার লীগ খেলেন ওল্ড ডিএইচএসের হয়ে। প্রথম বছরই সবার নজরে আসে তার বোলিং। পরের বছর খেলেন বিমানের হয়ে। অনেক ভালো খেলার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি সুযোগ পান অনূর্ধ্ব ১৯ এশিয়া কাপ ও ওয়ার্ল্ড কাপে। এশিয়া কাপ না খেলতে পারলেও অনূর্ধ্ব ১৯ ওয়ার্ল্ড কাপে অনেক ভালো খেলেন তিনি। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের খেলায় খেলার সুযোগ আসে তার। অনেক ভালো খেললেও হাঁটুতে ব্যথা পান। সেটি তখন প্রকট হয়ে ওঠেনি। এরপরই খেললেন বিপিএল-এ। চিটাগং কিংসের পক্ষে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) এবং ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোনের পক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ (বিসিএল) খেলেন তিনি। এরপরই ইনজুরি আঘাত হানে তাকে। ইনজুরির কারণেই জাতীয় দলের শ্রীলঙ্কা সফর থেকে দূরে সরে পড়েন তিনি। বিসিবি থেকে তাকে অস্ট্রেলিয়াতে পাঠানো হয় চিকিত্সার জন্য। ১১ মাস কঠোর পরিশ্রমের পর আবার মাঠে ফিরে আসেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে লাল-সবুজ দলের হয়ে অনেক ভালো বল করেন। এরপরই সুযোগ আসে সেই স্বপ্ন পূরণের। হাবিবুল বাশার সুমন তাকে ফোন দিয়ে জানান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশের শেষ ম্যাচটিতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন তিনি। প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস না করতে পারলেও পরে তৈরি হন সেই আরাধ্য ক্ষণের জন্য। যখন জাতীয় দলের হয়ে জাতীয় সংগীত গাইছিলেন চোখ দিয়ে পানি চলে এসেছিল, গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল তাসকিনের। খেলায় অন্তপ্রাণ সদ্য আঠারোতে পা দেওয়া ছেলেটি এখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের গর্বিত সদস্য। এরজন্য তিনি কৃতজ্ঞ নিজের পরিবারের কাছে। যারা সবসময় তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তিনি ইনজুরিতে পড়লে বিসিবি নিজ উদ্যোগে তাকে অস্ট্রেলিয়া পাঠায়, যার জন্য তিনি বিসিবির কাছেও অনেক কৃতজ্ঞ। বর্তমানে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি)-তে ইংরেজিতে পড়ছেন তিনি। আগামী দশ বছর যেন কোনো ইনজুরি ছাড়া জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারেন—এ রকমই আশা তার। মরনে মরকেল, ডেল স্টেইন, মাশরাফি বিন মর্তুজার ভক্ত তাসকিন চান বিশ্বের সেরা ফার্স্ট বোলারদের একজন হতে। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে নিজের অস্তিত্বের কথা জানান দিতে চান এই তরুণ পেসার। তরুণ এই পেসার নতুনদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, ‘সবসময় বড়দের সম্মান করবে। অহংকার থেকে দূরে থাকবে, বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করবে। কোনো সময় প্র্যাকটিস থেকে নিজেকে বিরত রাখা যাবে না।’ নিজেকে গড়ার কাজ নিজে করার জন্য নতুনদের আহ্বান জানালেন তিনি। তার মতে, মানুষ নিজের কোচ নিজেই। নিজের ভুল যারা নিজ থেকে বুঝে নিজে সমাধান করতে পারে, তারা সফল হবেই।
