আলোকিত একজন

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩১
সফল মানুষ, হাজার মানুষের মধ্যে বিশেষ মানুষ। সাধারণের চেয়ে এমন কিছু ভিন্নতা অর্জন করে যার ফলে তারা সফল হয়ে ওঠেন। তাদের এই সফলতার পেছনে যে শুধু বিশেষ মেধা বা প্রতিভাই মূল কারণ তা কিন্তু নয়, এই গুণের সাথে যোগ হয়েছে প্রচেষ্টা, পরিশ্রম, আত্মনিয়োগ। তাদের এই সফলতার গল্পগুলো আমাদের জীবনেও ফেলতে পারে ইতিবাচক প্রভাব। তেমনই একজন আলোকিত মানুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমাদের আজকের আয়োজনে উঠে এসে এই সফল মানুষটির বেড়ে উঠার গল্প। লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ‘আলোকিত মানুষ চাই’—স্লোগানকে সামনে রেখে যে মানুষটি আলোকিত মানুষ গড়ার ব্রত নিয়েছেন তাকে আমরা সবাই চিনি। তিনি আমাদের সবার প্রিয় সায়ীদ স্যার। পুরো নাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ‘আলোকিত মানুষ চাই’ আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে সত্তরের দশকের শেষ পর্বে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এই কেন্দ্র পরিচালিত মূলত বই পড়া কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের হাজার হাজার স্কুল-পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন। এ ছাড়াও কেন্দ্র পরিচালিত আরও নানারকম সামাজিক কাজ দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃত্। বিনোদন ও সৃজনশীলতার গুণে টিভি উপস্থাপনাকে তিনি নিয়ে গেছেন মননশীলতার উচ্চতর স্তরে। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, জার্নাল, অনুবাদসহ সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি তার সৃজনশীলতা ও মননের পরিচয় রেখেছেন। ১৯৪০ সালের ২৫ জুলাই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস ছিল বাগেরহাট জেলার কামারগাতির কচুয়ায়। তার পিতা মরহুম আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন কলেজ শিক্ষক ও অধ্যক্ষ। তার কর্মসূত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের নানা জায়গায়। শিক্ষক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেছেন। অধ্যাপক হিসেবে তার খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য। তিনি শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন ১৯৬১ সালে, মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি কিছুকাল সিলেট মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল তিনি রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবন শুরু করেন। সেখানে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর তিনি ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে যোগ দেন (বর্তমানে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ)। এই কলেজে তিনি দু’ বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র তেইশ। এরপর তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজ ঢাকা কলেজের তত্কালীন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে সেখানে যোগদান করেন। ঢাকা কলেজেই তিনি তার শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। সে সময় ঢাকা কলেজ ছিল দেশসেরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলনস্থল। অধ্যাপক আবু সায়ীদ যখন ঢাকা কলেজে যোগ দেন তখন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ও গদ্য লেখক শওকত। ঢাকা কলেজের শিক্ষকতা জীবন তিনি অত্যন্ত উপভোগ করতেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ছেলেবেলায়, স্কুল থেকে কলেজে উঠে, অর্থনীতির বইয়ে পড়েছিলাম কেন একজন শিল্পপতি, কন্ট্রাক্টর বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীর চেয়ে একজন শিক্ষকের বেতন কম। যুক্তি হিসেবে সেখানে বলা ছিল একজন শিক্ষকের জীবন কাটে মার্জিত, পরিশীলিত পরিবেশে, বৈদগ্ধময় ব্যক্তিদের সাহচর্যে, উচ্চতর জীবনচর্চার অবকাশময় আনন্দে, জীবনের সেই মর্যাদা, তৃপ্তি বা শান্তি ওই ব্যবসায়ী বা নির্বাহীর জীবনে নেই। এই বাড়তি প্রাপ্তির মূল্য দিতে শিক্ষকের আয় তাদের তুলনায় হয় কম। ঢাকা কলেজের শিক্ষকতায় ওই তৃপ্তি আমার এত অপরিমেয় হয়েছিল যে, কেবল বেতন কম হওয়া নয়, আমার জন্য হয়তো বেতন না-থাকাই উচিত হতো। এই পাওয়া যে কতটা তা বুঝেছিলাম কিছুদিনের জন্য অন্য কলেজে গিয়ে।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য কিছু পুরস্কারের কথা তুলে ধরা হলো ১৯৭৭ সালে পেয়েছেন ‘জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার’; ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন ‘মাহবুব উল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার’; ১৯৯৯ সালে পান ‘রোটারি সিড পুরস্কার’; ২০০০ সালে পান ‘বাংলাদেশ বুক ক্লাব পুরস্কার’; ২০০৪ সালে পেয়েছেন ‘র্যামন ম্যাগস্যাসে পুরস্কার’; ২০০৫ সালে পেয়েছেন ‘একুশে পদক-২০০৫’ এবং ২০০৮ সালে অর্জন করেন ‘পরিবেশ পদক-২০০৮’।