সময়ের দাবি

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কালক্ষেপণ কেন

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৮
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে বলে বেশ কথাবার্তা চলেছে; প্রথমে গুঞ্জন ছিল, পরে স্থান নিয়ে বিবাদ ছিল, আরো পরে সরকারের কিছু উদ্যোগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদের শেষের দিকে মনে করা হয়েছিল যে, এ বিষয়ে সংসদে একটি বিল উত্থাপিত হবে এবং তা পাস হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন শাহজাদপুরে এ ব্যাপারে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল। স্থানীয় জনগণ বেশ জোরেশোরে দাবি-দাওয়া পেশ করেছিল। শেষের দিকে এ নিয়ে আর কোন কথাবার্তা শোনা যায়নি। শেষ পর্যন্ত কিছু হৈ চৈ ছাড়া তেমন কিছু হয়নি। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কম নেই, নিয়মিত এর সংখ্যাও বাড়ছে। সরকার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিটি জেলায় একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। তাই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে প্রতিষ্ঠা হতে চললে সেটি তেমন কোন উচ্চমার্গের ব্যাপার মনে হবার কথা নয়, সে বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখানোরও কিছু নেই। তবু অনেকে আগ্রহান্বিত হয়ে পড়েছিলেন যখন কবিগুরুর নামে শাহজাদপুর বা শিলাইদহে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করতে এগিয়ে আসে। আমি নিজেও একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে আমার আগ্রহ ও মতামত জানিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ নিজে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করেছিলেন শান্তিনিকেতনে এবং তাঁর নামে কলকাতায় আরো একটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তিনি আমাদের অন্যতম উত্তরাধিকার হলেও আমাদের দেশে তাঁর নামে কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আমরা কবি নজরুলের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। সেই বিশ্ববিদ্যালয় চলছে তবে যেভাবে আমরা একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় তা পূরণ করতে পারেনি বা করতে দেয়া হয়নি। রবীন্দ্রনাথের নামে যে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শোনা যাচ্ছে সে বিষয়ে ৮.০৪.১৪ তারিখে সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং আগামী শিক্ষা বছরে এতে ছাত্র ভর্তি করা হবে। আমরা জানি না, এটা রাজনৈতিক বক্তব্য কিনা। এবং তিনি সত্যি কতদূর এ নিয়ে এগিয়েছেন তাও আমরা জানি না। আমরা খানিকটা উদ্বিগ্ন দুটো কারণে। প্রথমত, প্রায় চার বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ঢাক-ঢোল পিটানো হচ্ছে, এলাকার মানুষজন দাবি জানাচ্ছে কিন্তু বাস্তবসম্মত তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এখন যদি তাড়াহুড়ো করে কিছু করা হয় সেটার চেহারা কেমন হবে? দ্বিতীয়ত, আমাদের এটাকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অন্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখছেন যেখানে সাধারণত কিছু আগ্রহী ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের চাকরির ব্যবস্থা হয়, উন্নত লেখাপড়ার বিষয়টা যেখানে গৌণ হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবার আগেই এরকম নঞর্থক মন্তব্য করার জন্য আমি দুঃখিত তবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাকে এরকম বক্তব্য প্রদানে উত্সাহিত করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে শাহজাদপুরে যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হতে যাচ্ছে সেটাকে আমরা সত্যিকার অর্থে আধুনিক ও আন্তর্জাতিকমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখতে চাই যা রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বুঝতেন তার কিছু নমুনা বিশ্বভারতীতে লক্ষ্য করা যাবে। তিনি ‘বিশ্বভারতী’ নামক তাঁর একটি লেখায় বলেছিলেন—‘শিক্ষার প্রকৃত ক্ষেত্র সেইখানেই যেখানে বিদ্যার উদ্ভাবনা চলিতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য কাজ বিদ্যার উত্পাদন, তাহার গৌণ কাজ সেই বিদ্যাকে দান করা। বিদ্যার ক্ষেত্রে সেই সকল মনীষীদিগকে আহবান করিতে হইবে যাঁহারা নিজের শক্তি ও সাধনা দ্বারা অনুসন্ধান আবিষ্কার ও সৃষ্টির কার্যে নিবিষ্ট আছেন। তাঁহারা যেখানেই নিজের কাজে একত্রে মিলিত হইবেন সেইখানে স্বভাবতই জ্ঞানের উত্স উত্সারিত হইবে, সেই উত্সধারার নির্ঝরিণীতেই দেশের সত্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হইবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নকল করিয়া হইবে না।’ স্বভাবতই আমরা আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যলয় প্রতিষ্ঠার সময় এই রবীন্দ্রভাবনা দ্বারা তাড়িত হইনি। তবে এখন যেহেতুে রবীন্দ্রনাথের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেখানে তাঁর মতামতের গুরুত্ব দেয়া জরুরি। তিনি এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী প্রকার বিদ্যা অধীত হবে সেটাও স্পষ্ট করে বলেছিলেন। আমরা চাই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেইসব বিদ্যাশৃঙ্খলা পঠিত হোক এবং এটা স্বতন্ত্র একটি চেহারা পাক। সাহিত্য, ভাষা, দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, স্বাস্থ্য, কৃষি, দেশীয় সংস্কৃতি, লোকসাহিত্য, ইতিহাস, সংগীত এসব বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। আর ছিল শিক্ষাকে পল্লীর মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে যাতে শিক্ষা ব্যবহারিক উপযোগিতা পায়। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভার নামে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ সরকার নিয়েছেন তা ফলবতী হোক সেটা আমরা চাই তবে এটা যেন মামুলি কোন বিশ্ববিদ্যালয় না হয়, রবীন্দ্রনাথের কথায় যেন ‘সত্য’ বিশ্ববিদ্যালয় হয়। অন্তত রবীন্দ্র প্রতিভাকে বুঝতে ও ধারণ করতে পারে এরকম ব্যক্তিরাই যেন সেখানে জড়িত হন সেটা আমরা আশা করি। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে অনুরোধ করতে চাই যে, তারা যেন উপযুক্ত ব্যক্তিকে সেখানে সংযুক্ত করেন। লেখক :অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়