স্মৃতির হিমাগারে পল্টন ময়দান

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪২
পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারক স্বাধীন বাংলাদেশ ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গৌরব গাথার জন্ম এখানে ১৭৯১ সালে বিশাল-বিস্তৃত ফাঁকা এলাকায় গড়ে ওঠে মসজিদ এবং ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার মানচিত্রে সেই বিস্তৃত ফাঁকা এলাকাটিকেই পল্টন লাইন হিসাবে নামকরণ করা হয় ঢাকার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের স্মারক পল্টন ময়দান। ব্রিটিশ সেনাদের পদভারে জেগে উঠা বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। পূর্ব বাংলার আন্দোলনের স্মৃতিময় স্থান। স্বাধীন বাংলাদেশ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অসংখ্য গৌরবগাথার জন্ম দিয়েছে পল্টন ময়দান। ইতিহাস সৃষ্টির সাক্ষী সেই ময়দান আর নেই। চারদিক থেকে গড়ে উঠা বিভিন্ন স্থাপনা দখল করেছে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। শূন্য কিছু স্থান দিনের বেলা নির্ধারিত থাকে কার পার্কিংয়ের জন্য, আর রাতের বেলা পরিণত হয় ছিনতাইকারী এবং মাদকসেবী-ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্যে। একসময়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উত্তাল পল্টনে এখন মাদকদ্রব্যের নষ্ট হাওয়া। ঢাকাবাসীর চোখের সামনেই বিলীন হয়ে গেল ময়দান। হারিয়ে গেল ঢাকার এক ঐতিহ্য। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর উদ্দিন খান মামুন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ‘মহাপরিকল্পনা’ কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা সরকারই বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়নি। সকলেই নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য ঢাকার জমি ব্যবহার করেছে। পল্টন ময়দানও বাদ যায়নি। ইতিহাসের অনেক মোড় পরিবর্তনের সাক্ষী এ ময়দান রক্ষা পায়নি। তিনি মনে করেন, শাসক ও স্বার্থান্বেষী মহলের লুটেরা মনোভাবের কারণে এ ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। লুটেরা ও দখলের মানসিকতা কোনো সরকারের সময়ই থামেনি, সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করেনি। তাই সবার সামনেই হারিয়ে গেল পল্টন ময়দান। ঢাকার অন্যান্য ঐতিহ্যও এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, যাবে। সকলে মিলে সম্মিলিতভাবে লুটেরা বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে পারলেই এ দখল ঠেকানো সম্ভব হবে। ঢাকা জেলা ডিসি অফিস, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৮৫১ সালে ঢাকার মানচিত্রে পল্টন ময়দান ও সংশ্লিষ্ট এলাকাটিকে পল্টন লাইন নামে উল্লেখ করা হয়। ব্রিটিশ আমলে পল্টন ময়দান এলাকাটি নবাবপুর পুরনো রেলক্রসিং থেকে শুরু করে বর্তমান পুরানা পল্টন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি ছিল একেবারে শূন্য স্থান। তবে এরও আগে ১৭৯১ সালে পল্টন ময়দান এলাকায় একটি ছোট মসজিদ গড়ে উঠে। ইসলাম ধর্মের ইতিহাসের চার খলিফার নামে এটি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। পুরান এবং নতুন ঢাকার বিভাজকও বলা হত ময়দানকে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন ভবন গড়ে উঠতে থাকায় কমতে থাকে ময়দানের আয়তন। ব্রিটিশ আমলেই ময়দানে ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলা শুরু হয়। রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু হয় পাকিস্তান আমল থেকে। চারদিকে বিভিন্ন ভবন গড়ে উঠলেও পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকেও ময়দানের আয়তন ছিল বিশাল। পল্টন ময়দানে পাকিস্তান সরকারবিরোধী বহু আন্দোলন কর্মসূচি গৃহীত হয়। অনুষ্ঠিত হয় অনেক সমাবেশ। এ সময়ই তত্কালীন সরকার পল্টন ময়দানের উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করে। এটি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এতে ময়দানের আয়তন কমিয়ে এনে সমাবেশস্থল ছোট করাই সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও পল্টন এলাকা প্রায়ই উত্তাল হয়ে উঠত। এ সরকারের সময় ময়দানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে নির্মিত হয় মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম। গত দুই দশকে ময়দানের স্থানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠে ভলিবল স্টেডিয়াম, কাবাডি স্টেডিয়াম, অলিম্পিক ভবন, হ্যান্ডবল স্টেডিয়াম, মার্কেটসহ বিভিন্ন অফিস ও দোকানপাট। উন্মুক্ত স্থান বলে যেটুকু জায়গা রয়েছে তা ব্যবহূত হচ্ছে কার পার্কিংয়ের কাজে। গত ওয়ান ডে বিশ্বকাপের সময় এ কার পার্কিং স্থল স্থায়ী রূপ পায়। এর ফলে ময়দানের অবশিষ্ট ছোট পরিসরে খেলাধুলার যে সুযোগ স্থানীয় কিশোর-তরুণরা পেত তাও বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে রাজনৈতিক সমাবেশও। রাজনীতির মোড়ে পল্টন ময়দান ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে পল্টনে জনসভা আয়োজনের রীতি চালু হয়। বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয় এখানে। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক সমাবেশস্থল হিসেবে পল্টন ময়দান গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় স্থান হিসেবে বিবেচিত ছিল। ঢাকায় এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনগণের যাতায়াত সুবিধার কারণেই এটি হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারিতে ঢাকায় পল্টনে পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ভাষণ দেন তখনকার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন। তখন তার বক্তব্যে ফেটে পড়ে ছাত্র-জনতা। চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় ভাষা আন্দোলন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তানকে ইসলামিক রিপাবলিক বলে খসড়া পেশ করা হলে এর বিরোধিতা করেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পল্টনের জনসভায় তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন ও আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে তখনকার ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, ডাকসুর সহ-সভাপতি আসম আব্দুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই উজ্জ্বল দিনগুলোতে ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান অতিথির ভাষণ দেন। পল্টনের এ সমাবেশেই ছাত্রলীগ ৫ দফাভিত্তিক প্রস্তাব গ্রহণ করে ও ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ ঘোষণা করে। এ ইশতেহারেই ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’। বঙ্গবন্ধু অহিংস অসহযোগের ডাক দেন। পরে ২২ মার্চ সদ্যগঠিত ‘সাবেক সৈনিক পরিষদ’ পল্টনে বিরাট এক সভা করে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানায়। স্বাধীনতার পর এবং এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনেও পল্টন ময়দান ও সংলগ্ন এলাকা বিক্ষোভের বারুদে পরিণত হয়। পল্টন ময়দানে বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও। সর্বশেষ ২০১০ সালের শেষদিকে পল্টনের সংকীর্ণ ময়দানে বিএনপির সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর সেই সংকীর্ণ ময়দান আরো ছোট হয়েছে। অনুষ্ঠিত হয়নি উল্লেখযোগ্য কোনো সমাবেশ। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শরিফউল্লাহ ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ পল্টন ময়দান সংরক্ষণের অনেক বেশি দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল ঢাকায় বড় জনসভা করার একটি নির্দিষ্ট স্থান। বর্তমানে সমাবেশস্থলের জন্য যেভাবে পুলিশের উপর নির্ভর করতে হয়, তাও থাকত না। ময়দানটি বিভিন্ন স্থাপনায় ভরে ওঠার প্রক্রিয়ায় দুঃখজনকভাবে কেউ বাধা দেয়নি। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের অমনোযোগিতার বড় প্রমাণ এটি। পল্টন ময়দান হারিয়ে গেলেও এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। এ উদ্যোগ এখনই গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে পরের প্রজন্ম তাদের ইতিহাস নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হারিয়ে ফেলবে। দিনে গাড়ি, রাতে মাদকসেবীদের ময়দান পল্টন ময়দানের শূন্য স্থানটুকু এখন স্থানীয়দের কাছে আউটার স্টেডিয়াম নামে পরিচিত। এর পূর্বাংশের জায়গায় মৌসুমে কয়েকটি ফুটবল ক্লাব এখানে লিগের খেলা পরিচালনা করে। আর পশ্চিমাংশে কার পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহূত হয়। রাতের বেলা স্টেডিয়ামের কয়েকজন প্রহরী এলাকার মার্কেটের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত থাকে। এর মধ্যেই সন্ধ্যার পর থেকে মাদকসেবী ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী এখানে ভিড় করতে শুরু করে। চলে মাদক বেচাকেনাও। রাতের বেলা পথচারী এখানে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়াও নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্টেডিয়াম সুপার মার্কেট এলাকার দোকান মালিক ফরিদউদ্দিন বললেন, রাত ৮টার পর মাঠ ও চারপাশের এলাকা গাঁজার গন্ধে ভরে ওঠে। মাদকের ব্যবসাও চলে। পুলিশ এর সবই জানে। কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্য এ মাদকসেবী ও ছিন্নমূল মানুষের কাছ থেকে মাসোহারা নেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। ইতিহাসের বাঁকে পল্টনের পত্তন ‘বাংলা পিডিয়া’ এবং মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকা:স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ পাঠে জানা যায়, একটি নতুন সেনানিবাস তৈরি করার উদ্দেশ্যে ঢাকার তখনকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড’স নবাবপুর ও ঠাটারীবাজার ছাড়িয়ে শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেশকিছু অংশ সংস্কার করেন। সেখানে সিপাহীদের ছাউনি, অফিসারদের বাসস্থান এবং প্যারেড গ্রাউন্ড করা হয়। এ এলাকাটিই বর্তমান পল্টন বা পুরানা পল্টন এলাকা। পল্টন পুরনো পাণ্ড নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। সেনানিবাসটি মশা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন উপদ্রব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সেনাবাহিনীর জন্য পরিত্যক্ত হয়। এর সমর্থনে ১৮৪০ সালে ঢাকা ভ্রমণকারী ডেভিডসনের বক্তব্য পাওয়া যায়। ১৮৫৯ সালে তত্কালীন সার্ভেয়ার জেনারেলের ঢাকার মানচিত্রে পল্টনকে একটি বিরান অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়। সেনানিবাস লালবাগে স্থানান্তরের পর পল্টন এলাকাটির পরিচর্যার দায়িত্ব মিউনিসিপাল কমিটির কাছে দেয়া হয়। এর এক অংশে গড়ে ওঠে ‘কোম্পানির বাগান।’ আরেক অংশ খেলাধুলা এবং বিভিন্ন সময় সিপাহীদের কুচকাওয়াজের জন্য ব্যবহার করা হত। উনিশ শতকের শেষার্ধে পল্টনে মাঝে মাঝে জনসভা হতে শুরু করে। একবিংশ শতকে এসে সেই জনসভা এখন শুধুই স্মৃতি।