বৈসাবী উত্সবে মাতোয়ারা পার্বত্য অঞ্চলবাসী

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:১৭
পানিতে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার পার্বত্য অঞ্চলে শুরু হয়েছে বৈসাবী উত্সব। ভোর থেকেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ তাদের নিজস্ব পোশাকে সজ্জিত হয়ে ফুল ভাসাতে আসেন রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে। মা গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানানো হল সর্বজীবের সুখ ও শািন্তর। সারাজীবন ফুলের মতো পবিত্র রাখতে, ফুলের মতো সুরূপ দিতে, সব দুঃখ, বেদনা, গ্লানি, ব্যর্থতা দূর করে অনাগত সুন্দর, সফল ও স্বার্থক ভবিষ্যত্ দান করতে। এভাবে ভোরে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীদের নদীতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনার মধ্য দিয়েই পার্বত্যাঞ্চলে তিনদিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উত্সব বৈসাবী শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৭টায় রাঙ্গামাটি ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসনো, বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান ও বস্ত্রদান, ত্রিপুরা তরুণ-তরুণীদের গড়াইয়া নৃত্য, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী ও পিঠা উত্সব। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য অংসু চাইন চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সিনিয়র পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রীতি কান্তি ত্রিপুরা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের জনসংযোগ কর্মকর্তা অরুণেন্দু ত্রিপুরা, রাঙ্গামাটি গর্জনতলী ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সভাপতি সুরেশ ত্রিপুরা, সাধারণ সম্পাদক ঝিনুক ত্রিপুরা প্রমুখ। পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত এগারো ভাষাভাষীর চৌদ্দ পাহাড়ি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর এদিনটিকে যৌথভাবে ঐতিহ্যবাহী প্রধান উত্সব হিসেবে পালন করে থাকে। আজ রবিবার মূল বিজু। পুরনো বছরের সব দুঃখ, বেদনা, গ্লানি, ব্যর্থতা ধুয়ে-মুছে উত্সব আর আনন্দে মেতে ওঠার দিন। সব কাজ সেরে সব চিন্তা ঝেরে শুধু উত্সব আর আনন্দে কাটার দিন। দিনব্যাপী ঘরে ঘরে থাকবে আপ্যায়ন। ছোট-বড় সবার জন্য রয়েছে সুস্বাদু খাবারের সমাহার- বড়দের জন্য কানজি, জগড়া ও দু’চুয়ানি মদের আয়োজন। ঘরে ঘরে জমবে উত্সবের ফোয়ারা। বিজু উত্সবকে ঘিরে এবারও সমগ্র পার্বত্য জনপদ আনন্দমুখর হয়ে উঠেছে। তবে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ী ও বান্দরবান এই পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়িদের প্রতিটি ঘরে উত্সবের ধুম পড়ে গেলেও অভাব আর অর্থনৈতিক সংকট হতাশায় নিমজ্জিত করছে। চাকমা রীতি অনুযায়ী গতকাল ১২ এপ্রিল পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তিন দিনের সার্বজনীন উত্সব শুরু হয়। আজ ১৩ এপ্রিল উদযাপিত হচ্ছে মূল বিজু। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ গোজ্যাপোজ্যে দিন ও বর্ষবরণ উত্সব। গোজ্যাপোজ্যে দিন নানাবিধ পূজা-পার্বণ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তিনদিনব্যাপী উত্সব শেষ হবে। পার্বত্য আদিবাসীদের মতে, বিজু মানে আনন্দ, নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় আর নতুন প্রেরণা। উত্সবটি আনন্দমুখর করে তুলতে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় পালিত হচ্ছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে আয়োজিত এ উত্সবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু এবং অহমিকারা বিহু বলে আখ্যায়িত করে। কাপ্তাইয়ে বাংলা বর্ষবরণে সাংগ্রাই উত্সবের আয়োজন রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, বাংলা নববর্ষ বরণকে ঘিরে কাপ্তাইয়ের মারমা সমপ্রদায়ের সাংগ্রাই জল উত্সবের বর্ণাঢ্য আয়োজন শুরু হয়েছে। বাংলা বর্ষকে বরণ করতে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বৃহত্তম মারমা পল্লী কাপ্তাই উপজেলার চিত্মরম বৌদ্ধবিহার, চন্দ কাপ্তাইয়ের চিত্মরমে অনুষ্ঠিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীরবাহাদুর উশৈসিং এমপি উত্সবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। উত্সবের ব্যাপক প্রচারণা চলছে। উপজাতি তরুণ-তরুণীদের পরিবেশনায় জাই, পাংখুং, কাপ্যাং, রোদুক, চাগায়াং, লোন্ডিং, জুম, রোরাংসহ মারমাদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে সাংগ্রাইয়ের আয়োজনে। সাংগ্রাই উত্সব উদ্যাপনে কাপ্তাইয়ের উপজাতীয় পল্লীগুলোতে ব্যাপক আয়োজন চলছে। উত্সবকে ঘিরে পাহাড়ি অঞ্চলে ঘরে ঘরে বেড়েছে ব্যস্ততা।