আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। ১৪২১ সালের এই সূচনা দিনটি হতে পারে অনেক আনন্দের, অনেক আশার, অনেক স্বপ্নের, অনেক ভালোবাসার। সারাটা বছর যেন সেই আনন্দ-ভালোবাসা বুকের ভেতরে সঞ্চালিত হয়। কোন দোয়েল শিস দিল কি দিল না, কোন পাখি ডেকে উঠল কি উঠল না, কোন ফুল ফুটল কি ফুটল না, কোন পাতা ঝরল কি ঝরল না সেটা বিষয় নয়— বিষয় হলো বাংলা নববর্ষ আমাদের একটি ঐতিহ্য, একটি উত্সব। এই উত্সবে আমাদের প্রাণ আনন্দে আন্দোলিত হবে, উদ্বেলিত হবে সেটাই স্বাভাবিক। চারুকলার শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে গ্রামে-গঞ্জে বৈশাখী মেলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই উত্সব। শুধু তাই নয়, পান্তা-ইলিশ মরিচ-পিঁয়াজও নববর্ষের একটি উপাদেয় বিষয় হয়ে উঠেছে। সুতরাং আজকের দিনে যত আনন্দের কথা বলা যায় ততই মঙ্গল। কিন্তু শিকড়ে ফিরে যেতে দেখি আমাদের আনন্দগুলো কারা যেন শুষে নিচ্ছে। না বুঝতে পারছি, না বুঝাতে পারছি। না ফিরতে পারছি, না ফেরাতে। কে আমাদের সুন্দর সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করছে? কে আমাদের সোনার ক্ষেতে ক্ষতির খাল কাটছে? কে আমাদের আনন্দের উত্সব মাটি করছে? এসব প্রশ্নের অসমাপ্ত উত্তর এই লেখাটির শেষে দেবার চেষ্টা করব। তার আগে বলতে চাচ্ছি, একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন রাজনীতিবিদরা এটাই যথার্থ। রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতি যা একটি রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আইন-শৃংখলা যা মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনা যা উন্নয়নের প্রধান শর্ত। কিন্তু রাজনীতিবিদরা যদি সত্য-মিথ্যার দোলাচলে ইচ্ছেমতো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন সেক্ষেত্রে উপর্যুক্ত কোন বিষয়েই আর উজ্জ্বল সম্ভাবনা প্রত্যাশা করা যায় না।
প্রতিনিয়ত পাক খাচ্ছে আমাদের রাজনীতি। কখন কে কোন সুরে বা কোন ভাষায় কথা বলছেন তা বুঝা দুঃসাধ্য। কিছুদিন আগে মেজর জিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আখ্যায়িত করায় দেশজুড়ে তোলপাড় হলো। এখন আবার তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অর্বাচীনের মতো এসব কথা বলায় আমরা সাধারণ মানুষ এতটাই বিব্রত বোধ করি যে এসব রাজনীতিবিদের প্রতি শুধু উষ্মা প্রকাশ নয়, ঘৃণা প্রকাশ করেও নিবৃত্ত হতে পারি না। একে অপরকে ঘায়েল করতে হলে শুধু মিথ্যের আশ্রয় কেন নিতে হয় তা-ও আমাদের জানা নেই। বিএনপি আগে বলত, এমন কঠোর আন্দোলন করা হবে যে দেশ অচল করে দেয়া হবে। এখন কিছুটা নমনীয় হয়ে বলছে, সংলাপে বসতে হবে নইলে ভয়াবহ পরিণতি হবে। যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায় তারাই যদি অচল করার কথা বলে এটা কী ভাবে মেনে নেয়া যায়? আবার এখন ভয়াবহ পরিণতি কী হবে সেটাও বোধগম্য নয়। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি কী ভূমিকা পালন করছে তা জনগণের কাছে স্পষ্ট তো নয়ই, বরং পার্টির নেতারাও সংসদে তাদের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কেউ আবার বিএনপিকে অবৈধ বলছেন, খালেদা জিয়াকে শয়তানের বংশধর বলছেন। বিএনপি অবৈধ হলে কী করে তারা অতদিন অতবার রাষ্ট্র পরিচালনা করলেন? সুতরাং সব ক্ষেত্রে তথৈবচ ভাব। তা হলে, এই রাজনীতিবিদরা এই রাষ্ট্রটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা কেউই অনুধাবন করতে পারছে না।
আবার বৈশাখের কথায় ফিরি। আমরা যারা ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ বলে মুখরিত করে তুলি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন তারা কি কখনো ভাবি এই বৈশাখে আমাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানেরা কী করছে? আমাদের শিশুদের জন্য আমরা কী পরিবেশ দিয়েছি? নাগরদোলায় চড়ার চেয়ে তারা ফেসবুকে চ্যাটিং করতেই বেশি পছন্দ করে। ঘুড়ি উড়ানোর বদলে তারা রাজনৈতিক স্ট্যাটাসে লাইক দিতে আর কমেন্ট করতেই বেশি মজা পায়। বলছি না ইন্টারনেট প্রয়োজনীয় নয়, তথ্য-প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া যাবে না। সবকিছুকেই জানতে হবে তাদের। কিন্তু ভালো দিক আর মন্দ দিকটা বুঝানোর দায়িত্ব কে পালন করছে? একটি শিশুর বিকাশে কী ভূমিকা রাখতে পারছি আমরা? তাহলে ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদ কারা হবেন? আমরা তো উন্নয়ন চাই। আমরা চাই উড়াল সড়ক, আমরা চাই পাতাল রেল, আমরা চাই পদ্মা সেতু, আমরা চাই যানজট মুক্ত রাজধানী। আমাদের চাওয়াগুলো নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে কেউ কেউ। ভোট নিয়ে চিন্তা করে কেউ কেউ। দুরাশার দোলাচলে বসবাস করি আমরা। যথাযথভাবে কেউ আমাদেরকে সঠিক ও সুন্দর পথ দেখাতে পারেন না। অনেক প্রশ্ন মাথায় গিজগিজ করে, শুধু উত্তর খুঁজি। যে অসমাপ্ত উত্তরটি দিতে চেয়েছিলাম তা ছড়ার মাধ্যমে প্রকাশ করাটাই যথার্থ মনে করলাম।
কে প্রথম আর কে অবৈধ / প্রশ্নে ভীষণ তর্ক তো / কেউ বোঝে না এক নদীতে / চর কতো আর ঝড় কতো।
কে পক্ষে আর কে বিপক্ষে / সবার ভাষা কর্কশে /যে যতটা পারছে ততই /ধরছে তাদের দর কষে।
কে ঘোষক আর কে প্রেসিডেন্ট /কে ডুবে রয় অর্ঘ্যতে /ভাগের দ্বন্দ্বে যায় বুঝি আজ /স্বাধীনতাই স্বর্গতে!
কে আমি আর কে গো তুমি / দু’ভাগ হয়ে নাচতেছি—/একটি জাতি ক’দিন পারে /এমন করে বাঁচতে? ছি!!!
লেখক:কবি ও শিশুসাহিত্যিক
