স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদিত হাসপাতালেই অপচিকিত্সা

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:০০
খোদ রাজধানীতেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদিত একটি ‘হাসপাতালে’ চিকিত্সার নামে অপচিকিত্সা চলছিল। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে অবস্থিত এই ‘ন্যাশনাল কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল’। ড্রিল মেশিন হলো এই হাসপাতালে অপারেশনের প্রধান সরঞ্জাম। ড্রিল মেশিনের সাহায্যে হাসপাতালের মালিক দুই ভায়রা ভাই দীর্ঘ ৮ বছর ধরে কত শত রোগীর হাঁড় ফুটো করে ‘চিকিত্সা’ দিয়েছেন তা অজানা। তবে অনেক রোগী পরবর্তীতে পঙ্গু হয়েছেন এবং অনেকের ইনফেকশন হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতাল মালিক সুবল চন্দ্র পাইক ওরফে পাইক বাবু। তিনি এসএসসি পাস। অপর মালিক মাছ বিক্রেতা রতন কৃষ্ণ মজুমদার অষ্টম শ্রেণী পাস। পাইক বাবু অজ্ঞানকারী চিকিত্সক এবং রতন কৃষ্ণ মজুমদার অর্থপেডিক সার্জনের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ৫০ বেডের এই হাসপাতালটি অনুমোদন নিয়ে হয়েছে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য। হাসপাতালটির নেই যন্ত্রপাতি, বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক এবং শল্যবিদ। নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স। ন্যাশনাল কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ-যা গ্রামাঞ্চলের গোয়ালঘরে দেখা যায়। এই হাসপাতালে প্রথম দফা ১০ বেড, দ্বিতীয় দফা ২০ বেড এবং তৃতীয় দফায় ৫০ বেডের অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রোগী মারার এই হাসপাতালটির অনুমোদন পেতে পাইক বাবুর কোন অসুবিধা হয়নি। এখানে মোটা অংকের টাকার লেনদেন কাজ করেছে বলে পাইক বাবু জানান। এই কারণে হাসপাতালটি চিকিত্সা সেবার উপযোগী প্রতিষ্ঠান কিনা তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা মনে করেননি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এই হাসপাতালটি কিভাবে অনুমোদন পেলো তা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গতকাল রবিবার নির্দেশ দিয়েছেন। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদানেরও তিনি নির্দেশ দেন। গতকাল সরেজমিনে বাবর রোডের ১৬/১৪ নম্বর রোডের ৬ তলা ভবনের তিন তলায় হাসপাতালটির গেটে তালা ঝুলতে দেখা যায়। এর আগের দিন র্যাব-২ এর পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা অভিযান চালিয়ে দুই ভায়রাসহ ৭ জনকে আটক করে। ওই সময় দুই ভায়রা অপারেশন থিয়েটারে এক রোগীকে ড্রিল মেশিনের সাহায্যে পা ফুটো করে চিকিত্সা দিচ্ছিলেন। আটককৃতরা মোবাইল কোর্টকে জানান, ৮ বছর ধরে এই কায়দায় রোগীদের হাত-পা ফুটো করে অপারেশন করে আসছেন। কত রোগী পঙ্গু হয়েছে কিংবা মারা গেছে এর তথ্য তাদের জানা নেই। তবে প্রায় দিনই তাদের অপারেশন করা রোগী মারা যাওয়ার সংবাদ পান। মোবাইল কোর্ট হাসপাতালটি সিলগালা করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। চিকিত্সাধীন ১৭ জন রোগীকে পঙ্গু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেয় মোবাইল কোর্ট। দুই ভায়রাসহ ৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয় মোবাইল কোর্ট। পঙ্গু হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা রোগীদেরকে দালালরা ভাগিয়ে এই হাসপাতালে নিয়ে আসত। প্রতি রোগীর জন্য দালালকে ৫শ’ টাকা এবং বিল বাবদ ৩০ ভাগ দেয়া হয়। ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দালাল পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ন্যাশনাল কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে আনার দায়িত্ব পালন করে আসছে। জামালপুরের রোগী ফরিদের পায়ে ড্রিল মেশিন দিয়ে দুই ভায়রা অপারেশন করে। বিল বাবদ ৯০ হাজার টাকা দাবি করে। নিরীহ এই ফরিদের পক্ষে এত টাকা দেয়া সম্ভব না হওয়ায় তাকে এক মাস যাবত্ আটক রাখা হয়। পরে সম্পূর্ণ টাকা দিয়েই নিরীহ ফরিদ ছাড়া পায়। সিলেটের রূপ মিয়াকে টাকার জন্য দুই সপ্তাহ আটক রাখে। দুই ভায়রার বিল দিয়ে সে ছাড়া পায়। সুনামগঞ্জের রিপন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে অপারেশনের জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরবর্তীতে আরো ৬০ হাজার টাকার জন্য তাকে দুই সপ্তাহ আটক রাখা হয়। নরসিংদীর রওশন আরাকে ১ লাখ টাকার জন্য কয়েক সপ্তাহ আটক রাখা হয়। এই হাসপাতালটি রোগী নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রথমে স্বল্প মূল্যে এক দিনে অপারেশন করে রোগীকে ছেড়ে দেয়া হয়, অপরদিকে এই হাসপাতালে চিকিত্সককে না দেখালে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যাবে না। পঙ্গু হাসপাতালে ডাক্তার থাকে না এবং অপারেশন করতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। এসব কথা বলে দালালরা গ্রামাঞ্চল থেকে আসা সহজ-সরল রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যায়। আর ফুটো করার একমাত্র যন্ত্র ড্রিল মেশিনটি হার্ডওয়ারের দোকান থেকে কেনা বলে পাইক বাবু জানান। চিকিত্সক, নার্স ও যন্ত্রপাতি বিহীন এই নোংরা হাসপাতালটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কিভাবে অনুমোদন দিয়েছে তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মোটা অংকের উেকাচের বিনিময়ে এই হাসপাতালটি অনুমোদন দেয়। প্রতি মাসে ওই হাসপাতাল থেকে নির্ধারিত হারে মাসোহারা পেতেন দুর্নীতিবাজ ওই কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও মেডিক্যাল এডুকেশন) অধ্যাপক ডা. এম এ হান্নান বলেন, অনুমোদন নেয়ার সময় ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য জনবল দেখানো হয়েছে। অভিজ্ঞ ডাক্তাররা সেখানে নিয়মিত প্রাকটিস করে সে ধরনের কাগজপত্রও দেখানো হয়েছে। এসব বিষয়ে বিবেচনা করেই অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদন দেয়ার পর পরবর্তীতে কি ধরনের চিকিত্সা চলে তা যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয় না। তাদের জনবল অভাব থাকায় ওই সময় মনিটর করা সম্ভব হয় না বলে তিনি জানান।