জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার দুর্ভিক্ষ দেখে দেশের আপামর জনগণ দারুণভাবে হতাশ। প্রধান কারণ হিসাবে অনেকেই মনে করছেন, জন-প্রশাসনকে এমনভাবে দলীয়করণ করা হচ্ছে, যে কারণেই প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা একেবারে ভুলে যেতে বসেছে তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশে বেশিরভাগ জনগণ প্রত্যাশা করে জনপ্রশাসনে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও কর্মকর্তারা থাকবে সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ, দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। সুবিচার, সুশাসন, শুদ্ধাচার ও জনকল্যাণসহ জনজীবনে নিরাপত্তা বিধান, পিছিয়ে পড়া জনগণের পাশে থাকা হবে প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব। জনসেবায় দক্ষতা, দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধ এবং গণমানুষের জীবনের মৌলিক প্রগতি বিধান হবে তাদের আদর্শ। তাই তারা রাজকোষ থেকে বেতন পান এবং রাজকর্মচারী হিসাবে চিহ্নিত । তারা কোন দলের নয়, তারা হবে দেশের সকলের।
তাই প্রশাসনে যখন দলীয় ভাবনায় ও প্রভাবে নিয়োগ ও পদোন্নতি হওয়া দৃশ্যমান হয়, তখন এদেশের জনগণের মানসপটে নিদারুণ হতাশার প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘদিনের লালিত আদর্শ ও চেতনার পরিপন্থি কর্মকাণ্ড দেখে জনগণ হতাশা ব্যক্ত করে প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রকাশ্যে। অমুক জেলার জেলা প্রশাসক অমুক দলের একথা ভাবতেই দুঃখ হয় । গত ১৩ এপ্রিল, ২০১৪ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় একথাটিই অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এবং সঠিকভাবে বলেছে যাকে বলা যায় বর্তমান গণমানুষের প্রত্যক্ষ অনুভূতি।
অনেকের অভিমত হচ্ছে আমলাতন্ত্র অধিকমাত্রায় নিরপেক্ষতা হারিয়ে দলীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং স্বচ্ছতা প্রদর্শনে প্রতিপদে ব্যর্থতা প্রদর্শন করছে। জনপ্রশাসনে নিয়োজিত কিছু কর্মকর্তার ধারণা তারা শুধু তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য, জনগণের কাছে নয়। এছাড়াও তথ্য প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে জনগণকে বঞ্চিত ও বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ উঠছে। তথ্য কমিশনার অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম গত বছর ১৩ মে, ২০১৩ কমনওয়েলথ মানবাধিকার সংক্রান্ত ইনিশিয়েটিভ কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেছিলেন, আমলাতন্ত্রের কারণে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবরূপ লাভ করছে না। তাই তিনি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমের কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণকে এ ব্যাপারে তত্পর হতে আহবান জানান। এ আহবান গণমাধ্যম প্রতিপালন করলে অথবা প্রতিবাদী হয়ে গণমাধ্যম বাস্তবতাকে তুলে ধরলে দেশের উন্নতি হবে, গণতন্ত্র সঠিক রূপলাভ করবে। আরো সহজ করে বলা যায় গণতন্ত্র টিকে থাকবে। নতুবা গণতন্ত্র হিংসা বা বিদ্বেষ এবং সংঘাতের পরিভাষা হিসাবে রূপলাভ করবে।
রাজনীতির সাথে আমলাতন্ত্রের অধিকতর সম্পৃক্ততা বা নিবিড় সখ্যতা জনগণ ভালোভাবে দেখছে না, একথাটি সম্ভবত আমলাতন্ত্রের অনেকেই বুঝতে অতি বিলম্ব করছে। প্রশাসন ও রাজনীতি হচ্ছে দুটি আলাদা সত্তা, তবে পরস্পরের পরিপূরক। এ কথাই বলেছেন উড্রো উইলসন যিনি আধুনিক জনপ্রশাসনের পিতা এবং প্রধান প্রবক্তা। জনপ্রশাসন সম্পর্কে তিনি ১৮৮৭ সালে গবেষণা করে অভিমত দেন যে, রাজনীতি ও প্রশাসন হবে পৃথক। জনপ্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং তাদের নিয়োগ হবে প্রতিভা যাচাই এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
মূলত বিশ্ব জোড়া এ বক্তব্যকে স্বীকৃত পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং অনুসরণ করা হচ্ছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এখনও দল পরিবর্তনের সাথে কিছু আমলা রাজনৈতিকভাবে নিয়োজিত হয়, তবে তাদের সংখ্যা সামান্য এবং এনিয়ে বিতর্ক অব্যাহত আছে।
প্রশাসনকে কিভাবে অধিকতর গণমুখি ও অর্থবহ করা যায় এ বিষয়ে লুথার গুলিক এবং লিন্ডন আরউইক নামক দুইজন গবেষক উত্তম প্রশাসকদের দায়িত্ব হিসাবে পরিচালনা, সংগঠন, সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা জনপ্রশাসনের জন্য দক্ষতাকেই অধিকমূল্য দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে আধুনিক প্রশাসনের মূল কথা। তবে নব্বই এর দশকে নতুন এক জনব্যবস্থাপনার ধ্যান ধারণা প্রভাব বিস্তার করেছে। অনেক গবেষক এবং নতুন ধারণার প্রবক্তাগণ আমেরিকায় বলতে শুরু করেছেন, আধুনিক জনব্যবস্থাপনার আদর্শ হবে বেসরকারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্বুদ্ধ।
অর্থাত্ জনগণকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভাববে কাস্টমার (খরিদদার) হিসাবে। এখানে জনগণকে দেখা হবে অর্থনৈতিক ইউনিট হিসাবে, গণতন্ত্রের অংশীদার অথবা প্রজাতন্ত্রের সন্মানিত নাগরিক হিসাবে নয়। কোন সরকারি সেবা পেতে হলে অর্থ ব্যয় করতে হবে। অনেকেই মনে করেন এই হচ্ছে ডিজিটাল প্রশাসন-এর বার্তা। এ বিষয়ে অধিক আলোচনা করবো না, কারণ আমাদের দেশের জনগণ এজাতীয় কথা শুনলে উপহাস করবে অথবা আন্দোলন শুরু করবে। সরকার জনগণকে সকল সেবা দিতে বাধ্য, এ হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের ধ্যান-ধারণার অংশ।
একথা সত্য যে প্লটো, এরিস্ট্যাটল, কৌটল্য ( বিষ্ণু গুপ্ত), মিকিয়াভেলির মতো প্রাচীন প্রশাসনের প্রবক্তাগণ সমপ্রসারণবাদীদের বা রাজাদের প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে যে জাতীয় প্রশাসনের কথা বলেছেন তা বর্তমানে অতটা প্রয়োগধর্মী না হলেও দি রিপাবলিক, অর্থশাস্ত্র, দি প্রিন্স থেকে শেখার জন্য আছে অফুরন্ত ভাণ্ডার। যে কোন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের নীতি নির্ধারকদের এসম্পর্কে অবহিত হতে হবে এবং ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক উত্কর্ষ সাধন করা সম্ভব হবে।
পুুরানো কথা বা তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়ে বর্তমান নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। বিশ্বব্যাপী জনপ্রশাসন নিয়ে নানান ভাবনার অন্ত নেই। এসব আলোচনায় তৃতীয় বিশ্বের জন্য নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে অসামান্য অবদান রাখার উপায় খুঁজতে হচ্ছে। এছাড়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে জনপ্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মানবসম্পদ উন্নয়নের সাথে মূল্যবোধের মানসিকতাকে একীভূত করতে না পারলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সহজ হবে না বলে অভিমত ।
জনপ্রশাসনে নৈতিকতাকে আচরণের প্রধান রীতি হিসাবে চিহ্নিত করে গবেষণা লব্ধ উপাত্তকে ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। এখানেই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন আসে। অনেক জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বে যেভাবে রাজনীতিবিদেরা দুর্বৃত্তায়নে নিবেদিত বা নিমজ্জিত, এ সকল কালোবিড়ালের হাত থেকে নিরপেক্ষ এবং দক্ষ ও জনদরদী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদেরকে রক্ষা করার জন্য জরুরিভাবে জাতিসংঘকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার জনপ্রশাসনে গতিসঞ্চারের লক্ষ্যে সিভিল সার্ভিস এ্যাক্ট-এর সংশোধনের কাজ হাতে নিয়েছে আজ প্রায় ৭ বছর অতিক্রান্ত্ত হলো । কিন্তু আলোর মুখ দেখছে না এবং আদৌ তার বাস্তবায়ন হবে কিনা কেউ জানে না। কেন তা হচ্ছে না, এ প্রশ্নে অনেকেই মনে করেন সিভিল সার্ভিস এ্যাক্ট প্রণীত হলে জনপ্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো সহজ হবে না অথবা কথায় কথায় ও এস ডি করা সহজ হবে না।
সরকার শুদ্ধাচার কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে দাতা সংস্থার প্রভাবে। বর্তমানে তার বাস্তবায়ন করতে হবে, এজন্য নীতিমালা তৈরি করতে হবে। কিন্তু তা হচ্ছে না কারণ মন্ত্রীর দুর্নীতির সাথে সরকারি কর্মচারীকে জড়ানোর উপায় বের করতে গলদঘর্ম হচ্ছে সরকার।
এছাড়াও জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেশকিছু পুরানো প্রশাসনিক বিধি-বিধানের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আছে। অনেক প্রচলিত আইন ও বিধিমালায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এসবের মধ্যে আছে চাকরি (পুনর্গঠন ও শর্তাবলী) আইন ১৯৭৫, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসেস (পুনর্গঠন) আদেশ ১৯৮০, গণকর্মচারী (অবসর গ্রহণ) আইন ১৯৭৪, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১ সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের সংশোধন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয় বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এছাড়াও, গণকর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ তদানীন্তন সরকারের চাপে তাড়াহুড়ো করে সংস্থাপণ মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করে যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যবিহীন এবং এই আচরণ বিধিমালার আলোকে ‘অসদাচরণ’ কোনটি তা নির্ধারণ করাই কঠিন। এ ছাড়াও সরকারি কর্মচারী ( শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ পুরোপুরি নতুনভাবে প্রণয়ন করতে হবে,কারণ এ বিধিমালার আলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা গুরুদণ্ড প্রদান করা প্রায় অসম্ভব।
তদুপরি প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল আইন, ১৯৮০ বাতিল করতে হবে। প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল-এর মাধ্যমে আইনের আশ্রয় নিয়ে কালক্ষেপের সুযোগ নিয়েছেন অনেকে এবং শাস্তির মাত্রায় তারতম্য করে প্রশাসনকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। অবশ্যই কারো যদি কোন অভিযোগ থাকে তবে প্রচলিত আইনে মৌলিক অধিকার হিসাবে প্রতিকারের সুযোগ তাকে দিতে হবে।
সুশাসনের অঙ্গীকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশকে মধ্যআয়ের দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার বাসনা বিফলে যেতে পারে যদি জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং প্রশাসনকে দলীয়করণের মানসিকতা পরিহার করা না হয়। প্রশাসনকে দলীয়করণের প্রবণতা অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। জনপ্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে হবে অবশ্যই। কোন সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে তিনি চাকরি হারাবেন এবং কোন রাজনৈতিক দলের সাথে দৃশ্যমানভাবে জড়িত হলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরগ্রহণে বাধ্য করতে হবে, এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে । সরকারকে ভাবতে হবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা দেশের সকলের , কোন দলের নয় ।
লেখক : প্রাক্তন সচিব
