ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকী হত্যা মামলায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে র্যাব। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন এসএম জাহিদ সিদ্দকী ওরফে তারেক ওরফে কিলার তারেক (ঘটনার পর দিন বন্দুক যুদ্ধে নিহত), যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, মিলকীর ড্রাইভার মারুফ রেজা, সাগরের স্ত্রী ফাহিমা ইসলাম লোপা, জাহাঙ্গীর মন্ডল, শহিদুল ইসলাম, গণপূর্তের পিয়ন আমিনুল ইসলাম ওরফে হাবিব, গুলশানের ডিসিসি মার্কেটের শান্তা এক্সক্লুসিভ দোকানের মালিক সোহেল মাহমুদ ওরফে কানী সোহেল, হত্যায় ব্যবহূত যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর গাড়ির চালক চুন্নু মিয়া, আমিনুলের মামাতো ভাই আরিফ, বাড্ডার যুবলীগ কর্মী ইব্রাহিম খলিলউল্লাহ, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ও ডা. শরিফ উদ্দিন চৌধুরী পাপ্পু। প্রায় আটমাস মামলার তদন্ত শেষে মঙ্গলবার র্যাব- ১ এর সহকারী পুলিশ সুপার কাজেমুর রশিদ ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এদিকে, অভিযোগপত্রে পরিকল্পনাকারীদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে রিয়াজুল হক খান মিলকীর পরিবার। একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাত্কারে মিলকীর ভাই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কায়সার মিলকী অভিযোগ করে বলেছেন, আমরা এ চার্জশীট মানি না। চার্জশীটে উদ্দেশ্য-মূলকভাবে কয়েকজন আসামির নাম বাদ দেয়া হয়েছে। একটি পক্ষ মামলাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা অচিরেই এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেব।
এদিকে অভিযোগপত্রে এজাহার-ভুক্ত দুই নম্বর আসামি তুহিনুর রহমান ফাহিমসহ নয় জনকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। তারা হলেন সৈয়দ মোস্তফা ওরফে মুজতবা আলী রুমি, রাশেদ মাহমুদ, সাইদুল ইসলাম, সুজন হাওলাদার, জাহেদুল ইসলাম, ওয়াহেদুল আলম, দেওয়ান মোহাম্মদ ফরিদউল্লাহ ও মাহবুবুল হক।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৯ জুলাই রাত ১টা ৭ মিনিটে গুলশান-১ নম্বরের ১২৩ নম্বর রোডের ৪৩/বি-সপার্স ওয়ার্ল্ডে ঢোকার সময় মূল ফটকে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকীকে (৪৩) সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার পর ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেন মিলকীর ভাই মেজর রাশেদুল হক খান মিলকী।
সূত্র জানায়, চার্জশীটভুক্ত আসামিদের মধ্যে চারজন এখনো পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, ইব্রাহিম খলিলউল্লাহ, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ও ডা. শরিফউদ্দিন চৌধুরী পাপ্পু। পলাতকদের মধ্যে চঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখা গেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও মালামাল ক্রোকের জন্য আবেদন করেছেন। মামলার তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক এটিএম হাবিবুর রহমান বলেন, তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। মিলকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে, অভিযোগপত্রে তাদের নামই দেয়া হয়েছে।
চার্জশীটে এজাহারভুক্ত একাধিক আসামির নাম নেই: রিয়াজুল হক মিলকী হত্যার ঘটনায় তার ভাই মেজর রাশেদুল হক খান মিলকী বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়। তবে আদালতে জমা দেয়া চার্জশীটে এজাহারভুক্ত আসামিদের অনেককেই অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। মামলার এজাহারে দুই নম্বর আসামি হিসেবে তুহিনুর রহমান ফাহিমকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি সৈয়দ মোস্তফা, চার নম্বর আসামি রাশেদ মাহমুদ, পাঁচ নম্বর আসামি সাইদুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, ছয় নম্বর আসামি সুজন হাওলাদার, দশ নম্বর আসামি যুবলীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু ও এগার নম্বর আসামি হিসেবে ওয়াহিদুল আলম আরিফের নাম থাকলেও চার্জশীট থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অব্যাহতিপ্রাপ্ত রাশেদ মাহমুদসহ কয়েকজন কিলার তারেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা ঘটনার পর নিজের সহযোগীর গুলিতে আহত তারেককে গোপনে চিকিত্সা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুল আলম আরিফের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও রহস্যজনক কারণে তাদের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সরকারের দুই প্রভাবশালীর তত্পরতায় এই দুইজনের নাম চার্জশীট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
যে কারণে হত্যাকাণ্ড: মামলার তদন্ত সংস্থা র্যাব তাদের তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে মহানগর যুবলীগের রাজনীতিতে। এরপর যুবলীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুল আলম আরিফ, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও জাহিদ সিদ্দিকী তারেকের রাজনৈতিক উত্থান হয়। মতিঝিল ব্যাংক কলোনী এলাকার রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জমি নিয়ে বিরোধ, টেন্ডারবাজি ও চাঁদার টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কমলাপুরে রেলওয়ের ১৫ লাখ টাকার কাজের টেন্ডার, ডেসার এক কোটি টাকার টেন্ডার, ভাসানটেক এলাকায় ১০ কোটি টাকার জমি দখল, এজিবি কলোনিতে মাসে ১৫ লাখ টাকার ডিশ ব্যবসা, এজিবি কলোনির সরকারি জমি দখল করে দোকান বরাদ্দ বাবদ ২০ লাখ টাকা এবং ফুটপাত দখল করে দোকান বরাদ্দ দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মিলকী ও তারেকের মধ্যে দ্বন্দ্বের জের ধরে এ হত্যার ঘটনা ঘটে।
