দীর্ঘ এক যুগ পার হয়ে গেলেও উপকূলের উত্তাল নদীগুলোর ‘ডেঞ্জার জোন’ চিহ্নিত করার জন্য নতুন করে আর কোন জরিপ হচ্ছে না। পুরনো চিহ্নিত ‘ডেঞ্জার জোনে’ই প্রতি বছর ৭ মাস মেঘনা অববাহিকার বিশাল এলাকায় (নির্দিষ্ট নৌ-যান ব্যতীত) সকল প্রকার নৌ-যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকছে। গত কয়েক বছরের ন্যায় এবারও সেই পুরনো এলাকায়ই চলছে প্রশাসনের কড়া পাহাড়া। অথচ উত্তাল নদীগুলোর নতুন নতুন বিপজ্জনক এলাকা দিয়ে ছোট ছোট নৌ-যান চষে বেড়াচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
নৌ-যান চালকরা জানান, চর পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ চিহূিত ‘ডেঞ্জার জোনে’র অধিকাংশ স্থানে এখন বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। আর নদীর শান্ত অনেক এলাকা ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসাবে রূপ নিয়েছে। টানা এক যুগে কোন জরিপ না হওয়ায় যেসব নদীতে গভীরতা এবং স্রোতের পাশাপাশি ঝুঁকি বেড়েছে সেসব এলাকা সরকারিভাবে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে সেসব অশান্ত নদীতে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী পরিবহন করছে নৌযানগুলো।
সর্বপ্রথম কবে প্রমত্তা মেঘনায় ‘ডেঞ্জার জোন’ সনাক্তে জরিপ চালানো হয়েছে তা বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানাতে পারেনি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে একবার মেঘনায় জরিপ চালিয়ে ‘ডেঞ্জার জোনে’র সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছিল বলে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা ধারণা দিলেও তার সঠিক দিনক্ষণ জানাতে পারেননি। তবে সর্বশেষ ২০০০ সালের ১৮ জানুয়ারি জরিপ চালিয়ে মেঘনার ‘ডেঞ্জার জোন’ এলাকা কমিয়ে আনা হয়। এই এলাকায় ভোলার ইলিশা, দৌলতখান, মীর্জাকালু, আলেকজান্ডার, হাকিমউদ্দিন, তজুমদ্দিন, শশিগঞ্জসহ একাধিক স্থান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৭ মাস সেখানে সাধারণ নৌযান চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু বিআইডব্লিউটিসি’র পর্যাপ্ত সী-ট্রাক ও বে-ক্রসিং নৌযান না থাকায় এসব এলাকার যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ ছোট নৌ-যানে চলাচল করতে বাধ্য হয়।
এদিকে শাহাবাজপুর চ্যানেল ও ভোলা সদর উপজেলার ভাঙ্গন কবলিত কাচিয়া ইউনিয়ন এবং দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়ন যে প্রমত্তা মেঘনায় একসময় বিলীন হয়েছিলো সেখানেই কয়েক বছর আগে বিশাল চর জেগে উঠেছে। এসব ইউনিয়নের সাইনবোর্ড ঝুঁলিয়ে সেখানে পুনরায় বসতি গড়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও পাকা, আধা-পাকা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এক সময় শাহবাজপুরের এ চ্যানেলে ছিল শুধুই উত্তাল জলরাশি। ভবানীপুর ও কাচিয়াসহ শাহবাজপুর চ্যানেলের কয়েকটি স্থানে পাশাপাশি আরো কিছু ছোট-বড় চর জেগে উঠায় ইলিশা- মজু চৌধুরীর হাট রুটের সেই ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ এখন শান্ত নৌপথে রূপ নিয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ চিহ্নিত ‘ডেঞ্জার জোন’ এলাকায় শুধু বে-ক্রসিং ক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান চলাচলে সরকার থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত্ সংশ্লিষ্ট পথে এ ধরনের জাহাজ আর যাত্রী পরিবহন করছে না। ফলে ভোলা, লক্ষ্মীপুর, ইলিশা, মজু চৌধুরীর হাট, আলেকজান্ডার, মনপুরা, শশীগঞ্জ, হাকিম উদ্দিন, মির্জাকালু ও বেতুয়াসহ বিভিন্ন রুটে এখন ছোট ছোট নৌযানই হচ্ছে এসব এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা।
তবে বৈশাখের শুরুতে কাল বৈশাখী আঘাত হানতে শুরু করছে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায়। বাড়তে শুরু করছে নৌ-যান চলাচলে ঝুঁকি। বিশেষ করে তজুমদ্দিন-মনপুরা, চরফ্যাশনের বেতুয়া-মনপুরা, মির্জাকালু-আলেকজান্ডার রুট এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। ধারণক্ষমতার ২/৩ গুন যাত্রী নিয়ে পটুয়াখালীর গলাচিপা, দশমিনা, ছোট বাইশদিয়া, বড় বাইশদিয়া, ভোলার লালমোহন, মঙ্গলশিকদার ও চরফ্যাশনের বেতুয়া তজুমদ্দিনের শশীগঞ্জ থেকে মনপুরার হাজির হাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌযান চলছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
নৌযান চালক ও মালিকদের বক্তব্য- নতুন জরিপ করে উপকূলের ভয়ঙ্কর নদীগুলোর ‘ডেঞ্জার জোন’ চিহ্নিত করে পুনরায় বে-ক্রসিং ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ চালু করে বাকি রুটগুলোতে একতলা নৌযানের রুট পারমিট দিলে নৌপথের এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বন্ধ হবে। তা না হলে নৌ-দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই এভাবে যাত্রীদের ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হবে।
