বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিককে উদ্ধার করা যায়নি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত এমন কাউকেও আটক করতে পারেনি পুলিশ। নিশ্চিত হতে পারেনি অপহরণের কারণ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পড়েছে গোলক ধাঁধায়। তবে অপহরণকারীদের ব্যবহূত মাইক্রোবাসটি শনাক্ত করেছে পুলিশ। যার ব্যবহূত নম্বর প্লেট ছিল ভুয়া এ দিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘আবু বক্কর সিদ্দিককে অক্ষত উদ্ধারে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। আশা করছি তাকে খুব শিগগিরই উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’ নারায়ণগঞ্জ জেলা, ঢাকা মহনগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সহায়তার জন্য গতকাল পুলিশ সদর দফতর ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চতর অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে। এদিকে আবু বক্কর সিদ্দিককে উদ্ধারের দাবিতে গতকাল পরিবেশবাদী ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। রাজধানীর মহাখালীস্থ ব্র্যাক সেন্টারে নাগরিক সমাজ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিশিষ্টজনরা আবু বক্কর সিদ্দিককে উদ্ধারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ ছিল দিনভর উত্তাল। ফতুল্লাস্থ হামিদ ফ্যাশন গার্মেন্টসের শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। তারা স্মারকলিপি প্রদান করেছে জেলা প্রশাসকের কাছে । পাশাপাশি রিজওয়ানা হাসান গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা দফতরে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, অপহরণের পর দায়ের করা মামলার সূত্র ধরেই তদন্ত এগুচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে কথা বলে শত্রু কারা থাকতে পারে সে ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এখনও উল্লেখযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ জানান, র্যাব রিজওয়ানার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। কী কারণে অপহরণ এ নিয়ে কোন কথা বলেননি তিনি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, তারা ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছেন, বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সিসিটিভিতে ধারণ করা মাইক্রোবাসের ছবি ও বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। এগুলো যাচাই বাছাই করে অপহরণের ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে নীল রঙের মাইক্রোবাসটি চলে গেছে। সেই মাইক্রোবাসের নম্বরটি ভুয়া। এ গাড়িটি অপহরণকারীরা ব্যবহার করেছে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে মাইক্রোবাসটি যাত্রাবাড়ী থেকে ফ্লাইওভারে উঠে বের হয় পলাশীর মোড় দিয়ে। এরপর গাড়ি কোন দিকে যায় তা নিশ্চিত করা যায়নি।
গোয়েন্দা পুলিশের ঐ কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্ত করছে ফতুল্লা থানা পুলিশ। তারা তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছেন।
মাইক্রোবাসের নম্বর ভুয়া
অপহরণের ঘটনায় ব্যবহূত মাইক্রোবাসটি (নীল রঙের, হাইএস, চট্টগ্রাম মেট্টো-গ-১৭-৮৩২৭) শনাক্ত করেছে পুলিশ। আর এটি নম্বর ভুয়া বলে জানিয়েছে বিআরটিএ। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জানান, অপরহরণের পর (বুধবার) দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে নীল রঙের গাড়িটি যাত্রাবাড়ীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজা অতিক্রম করে। কিন্তু বিআরটিএ জানিয়েছে এ নম্বরের কোন গাড়ি নেই। সে হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে অপহরণকারীরা ভুয়া প্লেট নম্বর ব্যবহার করেছিল। তদন্ত কমিটির প্রধান নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে থাকা সিসিটিভিতে ধারণ করা ফুটেজ দেখে সন্দেহভাজন মাইক্রোবাসটি শনাক্ত করেন।
একই রঙের মাইক্রোবাস
একটি অসমর্থিত সূত্র দাবি করেছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানাধীন কাঞ্জন ব্রিজ এলাকা দিয়ে অপহরণকারীদের ব্যবহূত মাইক্রোসের (নীল রঙের) মতই একটি গাড়ি বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে অতিক্রম করেছে। তবে এ গাড়িতে কোন নম্বর প্লেট ছিল না। তবে এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, এ ধরনের তথ্য তার জানা নেই।
আশাবাদী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ইত্তেফাককে বলেন, আবু বক্কর সিদ্দিককে অপরহরণের ঘটনাটির বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে তদন্ত চলছে। অপহরণকারীদের ব্যবহূত মাইক্রোবাসটির খবর আমরা পেয়েছি। তাকে অক্ষত উদ্ধারে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। আশা করছি তাকে খুব শিগগিরই উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
অপর দিকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আবু বক্করকে উদ্ধারের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হলে সঙ্গে সঙ্গে তা জানানো হবে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে কীনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা এ ধরনের ঘটনা আশা করিনি। আমরা সবাই শান্তিতে বসবাস করতে চাই। তবে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি।
পুলিশ সদর দফতরে টিম
মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে (ফতুল্লার ইন্সপেক্টর তদন্ত) সহায়তার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসানকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চতর অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপর সদস্যরা হচ্ছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম, র্যাব-১১ এর উপ-পরিচালক মেজর মো : সাদিকুর রহমান, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান ও পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান।
গোয়েন্দা দফতরে রিজওয়ানা
গতকাল দুপুরে মহানগর গোয়েন্দা দফতরে (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় তিনি স্বামীকে উদ্ধারের ব্যাপারে ডিবির সহায়তা চান। এরপর তিনি ডিবি দফতরের গেটে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা বলেন, ‘স্বামীকে উদ্ধারের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে ঘটনাটি অবশ্যই পরিকল্পিত। হঠাত্ করে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো যায় না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনগত কর্মকাণ্ডের কারণে যারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই এ কাজ করেছে।’
রিজওয়ানা আরও বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সময় চেয়েছে। তারা বলছেন, তাদের কাছে কোনো ক্লু নেই। এ কারণে তারা সময় চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি স্বামীকে উদ্ধার করার ব্যাপারে দেশবাসীর সহায়তা চান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার পর আমার ফোনে দু’একটি ফোন এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এর বাইরে কিছু বলা যাচ্ছে না। রিজওয়ানা বলেন, তদন্তের অগ্রগতি জানতে আমি র্যাবসহ বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা সংস্থার দফতরে গেছি। তারা আমাকে আশা হারাতে নিষেধ করেছেন। তারা আমাকে বলেছেন, সমন্বিত কর্মপদ্ধতিতে তারা আমার স্বামীকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কতটুকু আস্থা আছে—এমন প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা বলেন, এ মুহূর্তে আশা হারানোর কোনো উপায় আমার নেই। আমার ও আমার পরিবারের একটাই চাওয়া, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরা যেন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। কে দোষী এটা আমার কাছে বড় বিষয় না, আমার স্বামীকে ফিরে পাওয়াই মূল বিষয়।
উদ্ধারের দাবিতে উত্তাল নারায়ণগঞ্জ
আবু বক্কর সিদ্দিককে উদ্ধারের দাবিতে গতকাল নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ-মানববন্ধন করেছেন হামিদ ফ্যাশনসের শ্রমিকরা। সকালে হামিদ ফ্যাশনসে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে এসে জমায়েত হন। এক পর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এসময় সড়কে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর চাষাঢ়ায় বিকেএমইএ কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। পরে শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তারা জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি প্রদান করেন।
দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে পরিবেশবাদী সংগঠন নির্ভীকের উদ্যোগে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়। এতে নির্ভীকের প্রধান সমন্বয়ক এটিএম কামাল বলেন, নারায়ণগঞ্জ এখন মৃত্যু উপত্যকতায় পরিণত হয়েছে। অপহরণ ও খুনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আগে বলা হলেও এটা প্রতিকারে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ কারণেই এ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
