পৃথিবীর বাইরের মহাকর্ষীয় শক্তির (বিশেষ করে চাঁদের) প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি ফুলে ওঠাকে জোয়ার ও নেমে যাওয়ার ঘটনাকে ভাটা বলা হয়। এই শক্তির জানা-অজানা বিষয়গুলো নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। এটি পৃথিবীকে একটি নির্দিষ্ট উপ-বৃত্তাকার কক্ষপথে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করে। ফলে পৃথিবী-চন্দ্র সমাহারের অবিরত পরিবর্তন হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। আবার মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে চাঁদ ও পৃথিবী একে অপরকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীর উপর চাঁদের এই আকর্ষণের প্রভাব দূরত্বের উপর নির্ভর করে। পৃথিবীর যে পাশ চাঁদের দিকে থাকে সে পাশে চাঁদ থেকে দূরত্ব কম থাকায় আকর্ষণ বেশি থাকে, আর পৃথিবীর অপর পাশে চাঁদ থেকে দূরত্ব বেশি থাকায় আকর্ষণ কম থাকে। এই আকর্ষণই জোয়ার-ভাটার সাথে সম্পর্কিত।
জোয়ার-ভাটার কারণ
পৃথিবীর যে পাশে চাঁদ থাকে সে পাশে চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীপৃষ্ঠের সমুদ্রের পানি তার নিচের মাটি অপেক্ষা বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। এ কারণে চাঁদের দিকে অবস্থিত পানি বেশি ফুলে উঠে। একই সময়ে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে, সেদিকের সমুদ্রের নিচের মাটি তার উপরের পানি অপেক্ষা চাঁদ কর্তৃক বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। আবার চাঁদ থেকে পানির দূরত্ব মাটি অপেক্ষা বেশি থাকায় পানির উপর চাঁদের আকর্ষণ কম থাকে। ফলে সেখানকার পানি চারিদিকে ছাপিয়ে উঠে। এক্ষেত্রে ফুলে উঠার কাহিনীটিই ঘটে। ফলে একই সময়ে চাঁদের দিকে এবং চাঁদের বিপরীত দিকে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির এই ফুলে উঠাকে জোয়ার বলে। আবার পৃথিবী ও চাঁদের ঘূর্ণনের কারণে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে গেলে ফুলে ওঠা পানি নেমে যায়। পানির এই নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (এক দিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং একবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়।
জোয়ার-ভাটার জন্য সূর্যের আকর্ষণও অনেকাংশে দায়ী। তবে অনেক দূরে থাকায় সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের থেকে কম কার্যকর। সূর্য এবং চাঁদ যখন সমসূত্রে পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয়, জোয়ারের পানি বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে ভরা কাটাল বা উঁচু জোয়ার বলা হয়। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য এবং চাঁদের মধ্য কৌণিক দূরত্ব যখন এক সমকোণ পরিমাণ হয় তখন একের আকর্ষণ অন্যের আকর্ষণ দ্বারা প্রশমিত হয়। তাই সবচেয়ে নিচু জোয়ার হয় যাকে মরা কাটাল বলে আখ্যায়িত করা হয়। জোয়ার বলতে আমরা শুধুমাত্র সমুদ্রের পানির স্ফীতিকেই বুঝি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চাঁদ-সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবীর স্থলভাগেও অনুরূপ প্রভাবের সৃষ্টি হয়। জোয়ার-ভাটার ব্যাপারটা হয় চাঁদের আকর্ষণে। চাঁদের আকর্ষণের কারণেই জোয়ার ভাটা এত শক্তিশালী হয়। সূর্যের ভর চাঁদের থেকে অনেক অনেক বেশি। যার ভর বেশি তার আকর্ষণও বেশি। বস্তু যত দূরে থাকবে তার আকর্ষণও যাবে তত কমে। চাঁদ কাছে হওয়াতে ভরে আকারে সূর্যের চেয়ে ছোট হয়েও আকর্ষণ করে সূর্য থেকে বেশি। পৃথিবী থেকে চাঁদ যে পরিমাণ দূরে সে তুলনায় সূর্য প্রায় চার শ গুণ দূরে অবস্থিত। ফলাফল দাঁড়ায় সমুদ্রে চাঁদের যে আকর্ষণ তা সূর্যের আকর্ষণের চেয়ে দুইশ’রও বেশি গুণ শক্তিশালী। অমাবস্যার সময় চাঁদ ঘুরতে ঘুরতে এমন অবস্থানে আসে যে পৃথিবী চাঁদ আর সূর্য এক সরলরেখায় হয়ে যায়। একই সরলরেখায় হওয়াতে সূর্যের আকর্ষণ যোগ হয় চাঁদের আকর্ষণের সাথে। তখন পানি ফুলে উঠে আরও বেশি। মাঝে মাঝে সমুদ্রের তলায় আগ্নেয়গিরির অগ্নির উদগিরণ হয়। আবার ভূমিকম্পও হয়। এই ভূমিকম্প আর আগ্নেয়গিরির উদগিরণও যুক্ত হয় জোয়ার-ভাটায়। শক্তি এতে যায় আরও বেড়ে। অবশ্য তা জোয়ার-ভাটার মোট আকর্ষণের তুলনায় খুব সামান্যই। সুতরাং জোয়ার-ভাটাকে আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ দেখালেও আসলেই প্রচণ্ড শক্তিশালী এই জোয়ার-ভাটা।
