তরুণদের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা হলো পড়া ভুলে যাওয়া। সেটা হোক পড়াশোনা বা হোক দৈনন্দিনের কাজকর্ম। অনেকে বলে থাকেন এটা তাদের উদাসিনতার কারণ, কিন্তু সবক্ষেত্রে হয়তো এই কথাটি প্রযোজ্য নয়। কেননা সবার স্মৃতিশক্তি যে সমান নয়। কারও কম কারও বেশি। সর্বোপরি পর্যালোচনা, মনোযোগের অভাব, পরিবেশ, অসুস্থতা ইত্যাদি কারণে এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতাটা বেড়ে যায়। তবে একটু সতর্ক হলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এ নিয়ে আমাদের এবারের আলোচনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন তাহের মানিক
প্রয়োজনীয় জিনিসটি দরকারের সময় খুঁজেই পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে যেখানে রেখেছিলেন সেখানে পাচ্ছেন না। একেবারে ভুলেই গেলেন তো গেলেন, আর যেন মনেই করতে পারছেন না। অনেকে আছেন নিজের ফোন নম্বরটাও মনে করতে পারেন না। আবার এমনও দেখা যায়, কোনো বিষয়ে কারও সাথে কথা হয়েছিল, অথচ পরে শুনলেও মনে করতে পারছেন না যে কী কথা হয়েছিল। এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমাদের কমবেশি সবারই আছে। দৈনন্দিন জীবনে নানা কিছু আমরা প্রায়ই মনে করতে পারি না। কারও নাম, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড কিংবা এটিএম মেশিনের পিন নম্বর আমরা ভুলে যাই অনায়াসেই। অনেকেই এই ভুলে যাওয়া মন নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকেন। এ থেকে জন্ম নিতে পারে বিষণ্নতার। তাদের জন্য বলছি এমন পরিস্থিতি থেকে আপনি মুক্তি পেতে পারেন সহজেই। কোনো কিছু না পারলে আমরা কী করি—বারবার অনুশীলন করি। ঠিক তেমনি আমাদের শরীরের অন্যান্য পেশির মতোই মস্তিষ্ককে আমরা যত ব্যবহার করব ততই আমাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পাবে। স্মৃতিশক্তির একটা অংশ পরিবেশ, শেখার মাধ্যম আর ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কিছু পদ্ধতি এখানে আলোচনা করা হলো যা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করবে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে আসে। তবু চেষ্টা করলে উপায় মেলে। কিছু বিষয় মেনে চলতে পারলে; মনে রাখতে না পারার সমস্যা কাটানো সম্ভব। আমরা বিভিন্ন মনোবিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ করে তেমন কিছু বিষয় নির্বাচন করেছি।
চেষ্টা করুন নিজেকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে। দুশ্চিন্তা মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে দেয়।
পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত জনদের সম্পর্ককে আলাদা ভাগে ভাগ করুন। একটা ডায়েরি বা নোটবুকে আলাদাভাবে প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িত বিশেষ দিবস, উপলক্ষ, কার কী প্রয়োজন ইত্যাদি লিখে রাখুন।
সম্ভব হলে ডিজিটাল ডায়েরি বা নোটবুক ব্যবহার করুন। এখানেও সবকিছু সংরক্ষণ করা যায়।
প্রতি মাসের শুরুতে ক্যালেন্ডারে প্রয়োজনীয় বিশেষ বিশেষ দিনগুলো দাগ দিয়ে রাখুন। এ দাগের জন্য নানা রঙের কালির কলম বা পেন্সিল ব্যবহার করতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ কাজের বেলায় সময়মতো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কাছের কাউকে আগেই বলে রাখতে পারেন।
ছন্দের মাধ্যমে ফোন নম্বর, ঠিকানা, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীর তারিখগুলো মুঠোফোনেও সেভ করে রাখতে পারেন।
শোবার রুমের বিছানার ওপর অথবা খাবার টেবিলের সামনে একটি সাদা কাগজ রাখতে পারেন। এই কাগজে প্রতিদিনের কাজ, কোন মাসে কার কী দিবস, কবে কখন কোথায় কার কাছে যাওয়ার কথা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো লিখে রাখতে পারবেন।
পরিবারের কী কী কার্যক্রম আছে; আলোচনা করেই আপনার নোটবুকে লিখে রাখুন।
বাসা, অফিস কিংবা ক্যাম্পাসে যারা আপনার খুব ঘনিষ্ঠ, তাদের বিষয়ে বিশেষ বিষয়গুলো লিখে রাখুন।
কোনোকিছু শোনার সময় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করুন। মনোযোগী মানুষেরা সহজে ভুল করে না।
আজকাল অনেকে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল। তারা মোবাইলে কিংবা কম্পিউটারে বিভিন্ন দিবস, উত্সব, পার্টি, উপলক্ষ, জরুরি তথ্য সংরক্ষণ করে অ্যালার্ম দিয়ে রাখুন। নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে অ্যালার্মটি বেজে ওঠে। তাই ভুলে যাওয়ার কারণ থাকে না। তা ছাড়া বর্তমানে বহুল জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ফেসবুকের মাধ্যমেও আপনি অনেক কিছু জানতে পারবেন।
ব্যস্ততার ভিড়ে নিজের জন্য কিছু সময় রাখুন। অবসর সময়ে আপনার করণীয় কাজের কথা ভাবুন। দেখবেন ঠাণ্ডা মাথায় ভাবার ফলে এমন অনেক কিছু মনে পড়বে, যা এতদিন আপনি ভুলেই ছিলেন। কিন্তু বিষয়টি ছিল ভীষণ জরুরি।
শরীর বিশ্রামে রাখুন, মনকে প্রফুল্ল রাখুন। এতে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক থাকে এবং স্মৃতিশক্তিও হয় প্রখর। এজন্য ঠিকমতো ঘুমানো এবং পরিমিত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন।
প্রয়োজন মনে করলে মনোচিকিত্সকের পরামর্শও নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, এ সমস্যা দূর করতে সবচেয়ে বেশি দরকার আপনার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইচ্ছা। সবসময় ভাবুন, আপনি কিছু মনে রাখবেন। দেখবেন আপনি সত্যিই তা পারছেন।
পড়া মনে রাখতে
প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কী পড়ছেন। আপনি কী পড়ছেন তাই যদি না বুঝতে পারেন তবে কখনই তা মনে থাকবে না। প্রয়োজনে একই বিষয়ের বা একই প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবে বুঝার জন্য অধিক সময় নিন। না বুঝে পড়া মুখস্থ করলে আপনি অতি সহজেই সেটি ভুলে যাবেন।
আপনি যা পড়ছেন তা নিয়ে অন্যের সাথে পর্যালোচনা করুন। অন্যের সাথে একটি বিষয় শেয়ার করলে এতে ত্রুটিগুলো সহজেই ধরা পড়বে। তখন ওই বিষয়টি আপনার মনে সহজেই গেঁথে যাবে। তাই পড়া মনে রাখার জন্য অন্যের সাথে পর্যালোচনার বিকল্প নেই।
পড়া মনে রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আপনি যা পড়ছেন তা মনোযোগ দিয়ে পড়া। কখনও পড়ার সময় অন্য কোনো বিষয়ের দিকে লক্ষ করা বা অন্য কোনো কিছু চিন্তা করা যাবে না। এতে মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে আপনি যা পড়ছেন তা মনে না থাকার আশঙ্কাই বেশি।
পড়ার বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা, বিষয়টির ওপর নোট সংগ্রহ করতে পারেন। পড়া মনে রাখার অন্যতম উপায় হলো শিক্ষক যা বলেন তা মনোযোগ দিয়ে শোনা। ক্লাসে শিক্ষকের কথা সঠিকভাবে শুনে মনে রাখতে পারলে পড়া মনে রাখা সহজ হয়। শিক্ষকদের লেকচার মনোযোগ দিয়ে শোনা বাঞ্ছনীয়।
পড়ার সময় মাঝে মাঝে বিরতি দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনি কী পড়ছেন তা মনে করতে চেষ্টা করুন। পড়ার বিষয়টা ভালোভাবে আওড়াতে শিখুন।
পড়ার পরিবেশ সম্পর্কে লক্ষ রাখুন, পড়া মনে রাখার জন্য আপনি কোন পরিবেশে পড়ছেন তাও গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় চেষ্টা করুন শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে পড়তে। এতে পড়া সহজেই মনে থাকবে।
কোনো বিষয় পড়তে মন না চাইলে সেটা জোর করে পড়তে যাবেন না। প্রয়োজনে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন। মন ফ্রেশ করার জন্য কিছুক্ষণ টিভি দেখা, গান শোনা যেতে পারে। ভয়ভীতি, ক্রোধ, আবেগজনিত কারণ অথবা দৈহিক ও মানসিক কারণে অসুস্থতার সময় পড়লেও পড়া মনে থাকে না। সবসময় চেষ্টা করুন উত্ফুল্ল মনে পড়তে। তাহলেই দেখবেন পড়া মনে রাখা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।
মস্তিষ্ককে সতেজ রাখুন
আমরা আমাদের মস্তিষ্ক যতখানি কাজে লাগানো উচিত ঠিক ততখানি কাজে লাগাই না। অথচ আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা প্রচুর। আমরা সঠিক ব্যবহার করি না বলে মনে করি আমরা অনেক কিছুই পারব না। মস্তিষ্ককে যথাযথ ব্যবহার করে দেখতে পারি মনে রাখার যোগ্যতা অনেক বেড়ে গেছে। তাই এমন কিছু কাজ বেছে নিতে হবে যা আমাদের কাছে নতুন আর চ্যালেঞ্জিং। তা হতে পারে নতুন কোনো ভাষা শেখা বা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখা। নতুন কোনো ধরনের খেলা শেখা আর প্রচুর পরিমাণে বই পড়া। এসব কাজে মস্তিষ্ক বেশি সচল আর সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের জন্য পুষ্টি আর এনার্জির প্রয়োজন। তাই যেসব খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি রয়েছে সেই ধরনের খাদ্য খাবারের তালিকায় রাখা প্রয়োজন। শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট তৈরি করে মস্তিষ্কের কার্যকরী ক্ষমতা বাড়ায় এমন খাবার গ্রহণ করা উচিত। আর এসব পাবেন সবুজ শাক-সবজি আর ফলমূলে।
ভুলে যাওয়াটা মানুষের সহজাত একটা অভ্যাস। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কেউ খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ভুলে যান। এসব ভুলে যাওয়া একসময় সম্পর্কের মাঝেও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করে। কাজের চাপেই হোক কিংবা যেকোনো কারণেই আপনার মনে ছিল না, প্রিয় মানুষটির জন্মদিনের কথা। এ নিতান্তই আপনার ভুল। কিন্তু আপনার প্রিয় মানুষটি হয়তো অন্য কিছু ভেবে বসতে পারেন। হতে পারে, এর সূত্র ধরে সম্পর্কটাই তিক্ত হয়ে উঠল। তাই নিজেকে ভুলে যাওয়ার বাতিক থেকে রক্ষা করা উচিত।
মডেল শোভা
